
ফিফা বিশ্বকাপের চলমান আসর প্রায় শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। এই টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ও ফাইনাল মিলিয়ে আর বাকি মাত্র ৮ ম্যাচ। এর মধ্যে কোয়ার্টার ফাইনালে চার, সেমিতে দুই, স্থান নির্ধারণী ও ফাইনালে একটি করে ম্যাচ মাঠে গড়াবে। আজ থেকে শুরু হচ্ছে শেষ আটের লড়াই। এই পর্বের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে টুর্নামেন্টের মুসলিম চমক মরক্কো ও বর্তমান সময়ের অন্যতম শক্তিশালী দল ফ্রান্স। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে আজ বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় শুরু হবে ম্যাচটি। শেষ আটে মরক্কো-ফ্র্রান্স মহারণেই নির্ধারণ হবে সেমিফাইনালের টিকিট কার? যদিও দু’দলের লক্ষ্য একটাই- শেষ চারে জায়গা করে নেওয়া। শক্তি, অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় ফ্রান্সকে এগিয়ে রাখা হলেও এবারের বিশ্বকাপে মরক্কো প্রমাণ করেছে তাদের অবমূল্যায়ন করার সুযোগ নেই।
টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে ওঠার পথে দু’দলই ভিন্ন ভিন্ন গল্প লিখেছে। গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে আত্মবিশ্বাস নিয়ে শেষ ষোলোতে ওঠে মরক্কো। এরপর শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের পথ খুলে নেয় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। শেষ ষোলোতে স্বাগতিক কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সামর্থ্যরে আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে উত্তর আুিফ্রকার দলটি। আক্রমণভাগের ধার, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় মরক্কো এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত নাম। অন্যদিকে ফ্রান্স এবার শুরু থেকেই ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার। গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পর নকআউটে এসে সুইডেনকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে ফারাসিরা। এরপর শেষ ষোলোতে কঠিন প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। যদিও সেই ম্যাচে গোলের ব্যবধান ছিল কম, তবুও পুরো ম্যাচজুড়ে বলের নিয়ন্ত্রণ ও সুযোগ সৃষ্টিতে আধিপত্য ছিল ফ্রান্সের। ইউরোপের এই দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড। তাদের রক্ষণ. মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগ- তিন বিভাগেই রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার। দ্রুতগতির উইং আক্রমণ, মাঝমাঠে বলের দখল এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতায় ফ্রান্স যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ংকর। টুর্নামেন্টজুড়ে তাদের রক্ষণও ছিল যথেষ্ট সংগঠিত, ফলে প্রতিপক্ষ সহজে গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। বিপরীতে মরক্কোর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি দলীয় সংহতি। রক্ষণভাগে অসাধারণ শৃঙ্খলা, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং মাঝমাঠের নিরলস পরিশ্রম তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বড় দলের বিপক্ষে ভয়হীন ফুটবল খেলাই তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী দলকে বিদায় এবং কানাডার বিপক্ষে একতরফা জয় দেখিয়ে দিয়েছে, মরক্কো শুধু চমক দেখাতে নয়, শিরোপার লড়াইয়েও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে এসেছে এবার।
এই ম্যাচে ব্যক্তিগত লড়াইও হতে পারে বেশ উপভোগ্য। ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে থামাতে মরক্কোর রক্ষণকে খেলতে হবে নিখুঁত ফুটবল। একই সঙ্গে মরক্কোর দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ ঠেকাতে ফরাসি ডিফেন্ডারদেরও থাকতে হবে সতর্ক। মাঝমাঠের দখল যে দল নিতে পারবে, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও অনেকটাই তাদের হাতে চলে যাবে। পরিসংখ্যানের দিক থেকে ফ্রান্স এগিয়ে থাকলেও নকআউট ফুটবলে অতীতের হিসাব খুব একটা গুরুত্ব পায় না। মরক্কো ইতোমধ্যেই একাধিক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হতাশ করেছে। ফলে এই ম্যাচেও তারা নির্ভার হয়েই মাঠে নামবে। পাশাপাশি ফ্রান্স জানে, সামান্য ভুলও স্বপ্নভঙ্গের কারণ হতে পারে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে আফ্রিকার দলগুলোর জন্য এই ম্যাচ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মরক্কো জিতলে তারা আরও একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় রচনা করবে। আর ফ্রান্স জিতলে টানা শক্তিশালী পারফরম্যান্স ধরে রেখে শিরোপার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালটি হতে যাচ্ছে কৌশল, গতি, শৃঙ্খলা ও মানসিক দৃঢ়তার লড়াই। একদিকে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে মরক্কোর দুর্বার আত্মবিশ্বাস- এ দুইয়ের সংঘর্ষে ফুটবলপ্রেমীরা উপভোগ করতে পারেন টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা একটি ম্যাচ। শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালের টিকিট কার হাতে উঠবে, তার উত্তর মিলবে ৯০ মিনিট, কিংবা প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সময় ও টাইব্রেকারের নাটকীয়তায়।
