যুদ্ধবিরতি নাকি ফাঁকা প্রতিশ্রুতি? ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে গাজাবাসীর মিশ্র প্রতিক্রিয়া

আন্তর্জাতিক

বদরুল হক
সোমবার, ৬ অক্টোবর ২০২৫

দীর্ঘ দুই বছর ধরে গাজায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা গাজাবাসীর মনে জাগিয়েছে সতর্ক আশার আলো। তবে হামাসের সম্মতি সত্ত্বেও ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলায় সেই স্বল্পস্থায়ী আশার আবেগ মুহূর্তেই যেন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে গাজাবাসী নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও প্রশ্ন করছেন—এই চুক্তি আদৌ তাদের জীবনে কী পরিবর্তন আনবে?

আশা আর হতাশার মিশেলে গাজাবাসীর অনুভূতি

হামাসের ইতিবাচক সাড়াকে ইসরায়েলি বন্দী মুক্তি ও গাজায় কর্তৃত্ব হস্তান্তরের বিষয়গত সম্মতি হিসেবে দেখছেন ৩৭ বছর বয়সী আবদেল রহমান আবু ওয়ার্দা। উত্তর গাজায় মানুষের চলাচল কমে আসাকে তিনি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করছেন।

তিনি বলেন, “উত্তর থেকে দক্ষিণে মানুষের চলাচল এখন প্রায় বন্ধ। এটাই প্রমাণ করে, মানুষ একটা সমাধানের আশা করছে। ইনশাআল্লাহ, আমরা সবাই শিগগিরই আবার উত্তরে ফিরে যেতে পারব।”

তবে নুসাইরাত শিবিরের সকলেই তার মতো এতটা আশাবাদী নন। যুদ্ধকে ঘিরে আশা আর নিরাশার দোলাচলে দুলছেন ৪৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ আবু দাহরুজ। তার ভাষ্যে, “হামাসের সম্মতি জানানোর খবর শুনে প্রথমে আমি আশান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু ইসরায়েলের হামলা থামতে না দেখে সেই আশা এখন ম্লান। আমার মনে হয়, বন্দী বিনিময়ের পর তারা গাজায় আরও ব্যাপক হামলা চালাবে।”

‘নতুন ধরনের দখলদারিত্বের আশঙ্কা’

ট্রাম্পের প্রস্তাবের যে অংশে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে, তা নিয়ে গাজাবাসীর মধ্যে তীব্র আলোচনা ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। আবু দাহরুজ এই প্রস্তাবকে ‘আরেক ধরনের দখলদারিত্ব’ বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, “হামাসের পক্ষে এই চুক্তি মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু এটা আসলে যুদ্ধবিরতির চুক্তি, যুদ্ধবন্ধের নয়।”

৭২ বছর বয়সী সুলেমান বখীতের বক্তব্য আরও তিক্ত, “ফিলিস্তিনিদরের ভাগ্য নিয়ে যেসব আলোচনা ও চুক্তি হচ্ছে, তা শুধু ইসরায়েলকে খুশি করতেই। আমরা এখন শুধু অপেক্ষা করছি আর দেখছি।”

বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসস্তূপের মাঝে জীবন

বখীতের বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস দুই বছরের। নুসাইরাত থেকে পালিয়ে এখন তিনি অস্থায়ী আশ্রয়ে। একইভাবে আল-আবেদ দেড় বছর ধরে মাগাজি শরণার্থী শিবির থেকে বাস্তুচ্যুত। আবু দাহরুজের ঠিকানা এখন দেইর এল-বালাহতে একটি আশ্রয়কেন্দ্র। আর আবু ওয়ার্দা ও তার পরিবার উত্তর গাজা থেকে মাত্র আট দিন আগে দেইর এল-বালাহতে এক আত্মীয়ের তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন।

আল-আবেদের ভাষ্য, “দুটি বছর পেরিয়ে গেল, কেউ আমাদের পাশে আসেনি। আমরা রাস্তায় বসবাস করছি। শীত আসছে, কিন্তু আমাদের কাছে পর্যাপ্ত কম্বল বা তাঁবুও নেই।”

আবু দাহরুজ সরাসরি হামলায় হারিয়েছেন তার তিন সন্তান। শোকাবৃত কণ্ঠে তিনি বলেন, “গত অক্টোবরে আমি আমার সব ছেলে-মেয়ে হারিয়েছি: আহমদ (১২), লায়ান (৭) আর দেড় বছরের মাসা। আমার স্ত্রী আর আমি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছি।”

বখীতের ৪২ বছর বয়সী কন্যা বুশরাকেও হারাতে হয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি সহায়তাপুষ্ট জিএইচএফ-এর একটি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্র থেকে রেশন নেওয়ার সময় তাকে হত্যা করা হয়।

অন্ধকারেও যে আশার আলো

এত বেদনা, ধ্বংস আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও আবু ওয়ার্দা এখনও আশা ছাড়তে নারাজ। তার বিশ্বাস, “এই যুদ্ধ একদিন থামবেই, আর আমরা আমাদের ধ্বংসস্তূপ থেকেই আবার নতুন করে গড়ে তুলব সবকিছু।”

গাজাবাসী এখন সন্ধান করছেন সেই ভবিষ্যতের, যা হয়তো এই চুক্তির মাধ্যমেই শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে—নাকি এটা হবে আরেকটি ফাঁকা প্রতিশ্রুতি, যার পরিণতি তারা ইতিমধ্যেই অসংখ্যবার দেখেছেন।


সংবাদটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানাতে পারেন নিচের কমেন্ট বক্সে। খবর৫২-এর সর্বশেষ আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *