ভারতের দ্বিচারিতার নগ্ন রূপ: ইসলাম গ্রহণ করলে ‘জিহাদ’, হিন্দু হলে ‘ঘর ওয়াপসি’!

আন্তর্জাতিক

তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশধারী প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাধীন ইচ্ছার ওপর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিপীড়নের এক চরম বৈষম্যমূলক চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশটিতে কোনো অমুসলিম নিজের ইচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী ও করপোরেট মিডিয়া একে ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘ষড়যন্ত্র’ বলে শোরগোল তোলে। অথচ কোনো মুসলিমকে জোরপূর্বক বা প্রলোভন দেখিয়ে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করা হলে তাকে ‘ঘর ওয়াপসি’ বা ‘মহৎ সামাজিক সংস্কার’ বলে ধুয়ে ফেলার অপচেষ্টা চলছে। দেশটির বিচার বিভাগ ও সংবিধান যেখানে প্রতিটি নাগরিককে নিজস্ব ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে, সেখানে ভারতের পুলিশ, প্রশাসন, মিডিয়া এবং উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর এই প্রকাশ্য দ্বিচারিতা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিকে বিশ্ব দরবারে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।



বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে ধর্মান্তরকরণ কোন দিকে ঘটছে, তার ওপর ভিত্তি করে পাল্টে যায় পুরো শাসনব্যবস্থার রঙ। কোনো হিন্দু তরুণ বা তরুণী যদি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে সেটিকে ‘ষড়যন্ত্রের ফান্দ’ হিসেবে রঙ চড়ানো হয়। সঙ্গে সঙ্গে অতি-সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ প্রশাসন, দায়ের করা হয় মিথ্যা এফআইআর, এমনকি মুসলিম যুবকদের বিনা অপরাধে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। হিন্দুত্ববাদী দলগুলো রাস্তায় নেমে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে এবং মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে ওই নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে পদদলিত করা হয়।



অথচ এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় যখন কোনো মুসলিম তরুণ-তরুণী সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে। তখন মিডিয়াগুলোর শিরোনাম হয়ে যায়— “ধর্মের প্রাচীর ভাঙল প্রেম” কিংবা “ঘরে ফিরল ঘরের সন্তান”। তখন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো উৎসবের আয়োজন করে, তাদের ওপর অর্থের বৃষ্টি ছড়ায় এবং পুলিশ প্রশাসন থেকে দেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা প্রোটোকল।



দীর্ঘদিন ধরে ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো ‘বেটি বাচাও, বহু লাও’ (কন্যা বাঁচাও, পুত্রবধূ আনো) নামে একটি চরম আগ্রাসী ও বৈষম্যমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আসছে। এর মূল লক্ষ্যই হলো মুসলিম মেয়েদের নানা কৌশলে হিন্দু পরিবারে নিয়ে আসা। একে তারা ‘সামাজিক সংস্কার’ বলে বৈধতা দিতে চায়, অথচ মুসলিম যুবকের সাথে হিন্দু তরুণীর বৈধ বিয়েকে তারা ‘লাভ জিহাদ’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করছে।



যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশসহ ভারতের একাধিক রাজ্যে তথাকথিত ‘ধর্মান্তর-বিরোধী আইন’ পাসের মাধ্যমে মূলত মুসলিমদের নিশানা করা হচ্ছে। ২০২০ সালে মোরাদাবাদের এক মুসলিম যুবক মোহাম্মদ রশিদ এবং তার অন্তসত্ত্বা হিন্দু স্ত্রী মুসকান যখন নিজেদের বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে যাচ্ছিলেন, তখন উত্তরপ্রদেশ পুলিশ রশিদকে গ্রেপ্তার করে এবং মুসকানকে নারী আশ্রয়কেন্দ্রে বন্দি করে রাখে। পরবর্তীতে মুসকানের গর্ভপাত ঘটে, যা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। অথচ মুসলিমদের ধর্মান্তরিত করার সময় এই আইনের কোনো কার্যকারিতা দেখা যায় না। এমনকি ২০২৬ সালের জুনে এসে উত্তরপ্রদেশের মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোতে ‘ধর্মান্তর প্রতিরোধ সেল’ গঠনের মাধ্যমে মূলত মুসলিম শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারির এক নতুন ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে।



ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং এলাহাবাদ হাইকোর্ট একাধিক রায়ে পুলিশের এই ‘কপি-পেস্ট’ বা সাজানো মামলার তীব্র সমালোচনা করেছে। ২০২০ সালের সালামত আনসারি মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ স্বেচ্ছায় বিয়ে ও ধর্ম পরিবর্তন করলে সেখানে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই। সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিককে স্বাধীনভাবে ধর্ম প্রচার ও গ্রহণের অধিকার দেওয়া হলেও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো সেই সাংবিধানিক অধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।



ভারতের কট্টরপন্থী মিডিয়া এবং উগ্রবাদী দলগুলোর এই দ্বিমুখী নীতি সমাজকে দিন দিন খণ্ড-বিখণ্ড করে তুলছে। ইসলামবিদ্বেষ ছড়াতে একদিকের ঘটনাকে চাঞ্চল্যকর ও অপরাধ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আর অন্যদিককে ফুল দিয়ে বরণ করা হচ্ছে।



বিশ্লেষকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, যদি ভারত সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে চায়, তবে মুসলমানদের ওপর এই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। ধর্মের ভিত্তিতে বিচার করার এই নগ্ন দ্বিচারিতা বন্ধ না হলে ভারতের তথাকথিত অখণ্ডতা ও ঐক্যের দাবি কেবলই ফাঁকা আওয়াজ হিসেবে থেকে যাবে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *