প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৫,
খবর ৫২ ডেস্ক

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশি-বিদেশি ছয়টি এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট ২ হাজার ১২৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো – বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, রিজেন্ট এয়ার, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার, জিএমজি এয়ারলাইন্স এবং ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ।
এর মধ্যে শুধুমাত্র বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর কাছেই বিমানবন্দরের পাওনা ১ হাজার ৭৮৬ কোটি ৯৬ হাজার ৩৪৬ টাকা। বকেয়া আদায়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় চিঠি দিয়েও কোনো ফল পাচ্ছে না।
বিমানবন্দরের একটি সূত্র জানায়, গত ২৫ বছরে ১৫টি এয়ারলাইন্স শাহ আমানত থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে শুধু দুটি বিদেশি এয়ারলাইন্স এখানে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত না হওয়ায় বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো একের পর এক তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে চট্টগ্রামের যাত্রীরা আন্তর্জাতিক রুটে যাতায়াতের জন্য ঢাকা যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
যাত্রী হয়রানি ও স্বল্প সুযোগ-সুবিধা
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী হ্যান্ডলিং সক্ষমতা মাত্র ৬ লাখ হলেও বর্তমানে এটি প্রায় ১৭ লাখ যাত্রী হ্যান্ডলিং করছে। এর ফলে যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এখানে ৩০০-৪০০ যাত্রীর ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত কাউন্টার নেই। লাগেজের জন্য যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, কারণ দুটি লাগেজ বেল্ট একসঙ্গে চললেও তা এত বিপুল সংখ্যক যাত্রীকে সামাল দিতে পারে না।
এছাড়া, শাহ আমানতে ফ্লাইট কার্যক্রম চলে সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত, কিন্তু বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ২৪ ঘণ্টা ফ্লাইট পরিচালনার সুবিধা চায়। বিদেশি এয়ারলাইন্স না থাকায় চট্টগ্রামের যাত্রীদের হয় ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে, নয়তো সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ওমানের মাসকাট হয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়।
বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর বিদায়
২০০০ সাল থেকে ১৭টি বিদেশি এয়ারলাইন্স শাহ আমানত থেকে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। এর মধ্যে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১১টি এয়ারলাইন্স তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। সেগুলো হলো – থাই এয়ার, থাই স্মাইল এয়ার, কুয়েত এয়ার, ফুকেট এয়ার, ড্রাগন এয়ার, মালিন্দো এয়ার, রোটানা এয়ার, হিমালয়ান এয়ার, রাস আল কাইমা (আরএকে) এয়ার, টাইগার এয়ারওয়েজ এবং সিল্ক এয়ার।
কোভিড-১৯ অতিমারীর পর আরও চারটি বিদেশি এয়ারলাইন্স চলে যায়:
- ২০২৩ সালের অক্টোবরে: স্পাইস জেট বিমান (ভারত) এবং জাজিরা এয়ারওয়েজ (কুয়েত)।
- ২০২৪ সালের ৮ মার্চ: ওমান এয়ার।
- ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর: ফ্লাই দুবাই।
বর্তমানে শুধুমাত্র বিদেশি এয়ারলাইন্স হিসেবে এয়ার এরাবিয়া ও সালাম এয়ার চট্টগ্রাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রী পরিবহন করছে।
বকেয়া রাজস্বের বিস্তারিত
শাহ আমানত বিমানবন্দরের হিসাব বিভাগ জানায়, তারা এয়ারলাইন্সগুলোর কাছ থেকে ৬ ধরনের অ্যারোনটিক্যাল চার্জ আদায় করে। জুন ২০২৫ পর্যন্ত ৬টি প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২৬ কোটি ৪৩ লাখ ৬০ হাজার ২৭৭ টাকা। এর মধ্যে মূল বিল ৩৪৮ কোটি ৯৬ লাখ ২১ হাজার ১৩৭ টাকা, ভ্যাট ৯৫ কোটি ৭১ লাখ ৭১ হাজার ৭১৮ টাকা এবং সারচার্জ ১ হাজার ৬৮১ কোটি ৭৫ লাখ ৬৭ হাজার ৪২৩ টাকা।
যেসব এয়ারলাইন্স বকেয়া পরিশোধ না করেই কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে:
- রিজেন্ট এয়ার: ২৫২ কোটি ৫৬ লাখ ৮৯ হাজার ৪৮ টাকা পাওনা।
- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ: ৫৪ কোটি ৯৬ লাখ ৪১ হাজার ৯৮৩ টাকা পাওনা।
- জিএমজি এয়ারলাইন্স: ২৯ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার ৪২৯ টাকা পাওনা।
এছাড়া, ইউএস-বাংলার কাছে ২ কোটি ৩৮ লাখ ৩৩ হাজার ৭৮৭ টাকা এবং নভো এয়ারের কাছে ১ কোটি ২০ লাখ ৪৮ হাজার ৬৮৪ টাকা পাওনা রয়েছে।
সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বকেয়া আদায়ের জন্য নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে এবং যেসব প্রতিষ্ঠান ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
