এডিপির আকার কমছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ষ আগামী বাজেট হবে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের, দায়িত্বজ্ঞানহীন না : পরিকল্পনা উপদেষ্টা

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, আগামী অর্থবছরের (২০২৫-২৬) বাজেট হবে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের বাজেট। দায়িত্বজ্ঞানহীন বাজেট হবে না। এখানে এমন ব্যয় থাকবে না যে সাময়িকভাবে মনে হবে জনতুষ্টির, কিন্তু আসলে এর দায় গিয়ে পড়বে পববর্তী বাজেটগুলোর ওপর।
গতকাল রাজধানীর শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভা (এনইসি) শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, অনেক অনেক ব্যয় আছে, যেমন টাকা ছাপিয়ে যে ব্যয় হয়, তার জন্য মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে পড়ে না। এর প্রভাব পড়ে পরবর্তী বছরগুলোতে। এখন অনেক বেতন বাড়ানো হয়, তার প্রভাবও এখনই পড়বে না। কয়েক মাস পড়ে গিয়ে পড়বে। এ কারণে বর্তমান সরকার দায়িত্বজ্ঞানহীন কিছু করবে না, যার দায় পড়বে পরবর্তী বাজেটে।
উপদেষ্টা বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট হবে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার বাজেট। যেখানে মূল্যস্ফীতি কমানোর কৌশল থাকবে। বাজেট ব্যবস্থাপনায় যাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসে– তার কৌশল থাকবে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা টেকসই করা হবে। সরকার এত বেশি বৈদেশিক ঋণ নিবে না যার জন্য পরিশোধের চাপ বাড়বে। ঋণের দুষ্টচত্রে যাতে না পড়ে, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। রাজস্ব সংগ্রহ বাজারে প্রচেষ্টা করা হবে। সরকারি ব্যয় সীমিত করা হবে এবং ঘাটতি কমিয়ে আনা হবে।
আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
এনইসি সভা শেষে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানান, আগামী অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দিয়েছে এনইসি। এটি আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা কম। প্রায় সব খাতেই বরাদ্দ কমছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতও। বাজেট ব্যয়ের দুটি ভাগ থাকে। একটি উন্নয়ন ব্যয় বা এডিপি, অন্যটি অনুন্নয়ন ব্যয়। সার্বিকভাবে বাজেটে কোন খাত কতটা গুরুত্ব পেল, তা বোঝা যায় সামগ্রিক বরাদ্দ দেখে। তবে উন্নয়ন বরাদ্দ দেখে বোঝা যায়, উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোন খাত গুরুত্ব পেল।
এডিপির আকার কমছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা
এবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ব্যাপক পরিমাণে কমানো হচ্ছে। এবার কমছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপির আকার হচ্ছে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য পরে তা কমিয়ে আনা হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুসারে, আগামী এডিপির অর্থের মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে জোগান দেওয়া হবে ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। আর প্রকল্প সহায়তা হিসেবে পাওয়া যাবে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। আগামী এডিপিতে ১ হাজার ১৪২টি প্রকল্প।
কোন খাতে কত বরাদ্দ
নতুন অর্থবছরে পাঁচ খাতেই যাচ্ছে মোট বরাদ্দের ৬৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। পরিকল্পনা কমিশন জানায়, চলতি অর্থবছরের (২০২৪-২৫) এডিপি বরাদ্দ ছিল দুই লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। তা কমিয়ে নতুন বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের চেয়ে নতুন এডিপি ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ কম।
পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে আগামী অর্থবছরের এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫৮ হাজার ৯৭৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৩৯২ কোটি ২৬ লাখ টাকা, বা ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৮ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ।
গৃহায়ণ ও কমিউনিটি সুবিধাবলী খাতে ২২ হাজার ৭৭৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যে দেওয়া হয়েছে ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এ পাঁচ খাতেই বরাদ্দ গেছে এডিপির ৬৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
আগামী অর্থবছরের এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ বিভাগ বরাদ্দ পেছে ৩৬ হাজার ৯৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ৩২ হাজার ৩২৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ পেয়েছে ২০ হাজার ২৮৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ১৩ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে।
এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১২ হাজার ১৫৪ কোটি ৫৩ লাখ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ১১ হাজার ৬১৭ কোটি ১৭ লাখ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ১১ হাজার ৩৯৮ কোটি ১৬ লাখ, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ৯ হাজার ৩৮৭ কোটি ৬২ লাখ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় আট হাজার ৪৮৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পাচ্ছে সাত হাজার ৭১৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দসহ মোট প্রকল্প রয়েছে এক হাজার ১৪৩টি। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৬৯টি, সমীক্ষার ১৯টি, কারিগরি সহায়তার ৯৭টি এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প থাকবে ৫৮টি। এগুলোর বাইরে অনুমোদনহীন নতুন প্রকল্প থাকবে ৯৯০টি। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের ৭৫৪টি, বৈদেশিক ঋণ পাওয়া সুবিধার জন্য ২০০টি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের ৩৬টি প্রকল্প রয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত প্রকল্প রয়েছে ৭৯টি। এডিপিতে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ২২৮টি প্রকল্পের তালিকা যুক্ত করা হয়েছে।
