
ঢাকা শহরের হকারদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে এবং পথচারী ও যান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় হকারদের নিবন্ধন, নির্দিষ্ট জোন ও সময় নির্ধারণ, ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়া এবং মাসিক ফি আদায়ের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন শাখা-১ হতে নীতিমালা প্রকাশ করা হয়। উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম সাক্ষরিত হকার নীতিমালায় শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে গতকাল ঢাকা দক্ষিণ সিটির নগর ভবন অডিটোরিয়ামে প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘ঢাকা শহর ও এর নাগরিকদের নাগরিক সুবিধা বহাল রাখতে হলে সুশৃঙ্খল হকার ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যেমন হকারদের জীবিকা বন্ধ করতে চাই না, তেমনি সারাদেশের ভাসমান মানুষকে হকার রূপে ঢাকায় পুনর্বাসন করাও সম্ভব নয়।’
?হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রশাসক বলেন, ‘আমরা সকলেই হকার সমস্যার একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সমাধান চাই। সরকার কর্তৃক জারিকৃত নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত ফি প্রদান সাপেক্ষে হকারদের নিবন্ধন, নিয়মিত নবায়ন এবং নির্ধারিত সড়ক ও সময়ে ব্যবসা করার শৃঙ্খলা মেনে চললেই এ সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব।’
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, হকার ব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পৃথক ‘হকার ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করবে। এই কমিটির মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য হকারদের নিবন্ধন দেওয়া হবে। নিবন্ধিত প্রত্যেক হকারকে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। আবেদন পাওয়ার এক মাসের মধ্যে জায়গা খালি থাকার প্রাপ্যতা বিবেচনায় নিবন্ধন দেওয়া হবে। আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। নিবন্ধনপত্রে হকারের ব্যবসার ধরন, নির্ধারিত জোন বা অবস্থান, স্টলের আয়তন, ব্যবসার সময় এবং মাসিক ফি উল্লেখ থাকবে। নির্ধারিত সময় ও স্থানের বাইরে হকার বসতে পারবেন না। পরিচয়পত্রে বারকোড ও কিউআর কোড থাকবে, যাতে সংশ্লিষ্টরা সহজেই নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করতে পারেন। নিবন্ধন অন্যের কাছে হস্তান্তর করা যাবে না।
জায়গা রাখতে হবে পথচারীর জন্য : হকার জোন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পথচারীর চলাচলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এলাকাভিত্তিক হকারের সংখ্যা জরিপ করে এমন সড়ক বা ফুটপাত নির্বাচন করতে হবে, যেখানে হকার বসানোর পরও পথচারীদের চলাচলের জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা অবশিষ্ট থাকে। প্রধান সড়কের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সড়ককে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। যানজট এড়াতে মেট্রো স্টেশন, বাসস্টপ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে হকার জোন নির্ধারণ করতে হবে।
ছুটির দিনে হলিডে মার্কেট : প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, শুক্রবার, শনিবার ও সরকার ঘোষিত ছুটির দিনে হলিডে মার্কেট বসানো যাবে। এসব মার্কেট সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চালু থাকবে। ছুটির দিনে সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনের চত্বর এবং সিটি করপোরেশন নির্ধারিত বিশেষ খোলা জায়গাকে হলিডে মার্কেটের জন্য বিবেচনা করা হবে।
সন্ধ্যা ৬টা থেকে নৈশকালীন মার্কেট : রাতে তুলনামূলক ফাঁকা হয়ে যায় এমন বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকার নির্দিষ্ট লেনে নৈশকালীন মার্কেট চালুর প্রস্তাব রয়েছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এসব মার্কেট পরিচালনা করা যাবে। মিরপুর-১০-এর হোপ মার্কেট, মিরপুর-১ গোলচত্বর এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গুলিস্তান, নিউমার্কেট, সদরঘাট ও বায়তুল মোকাররম এলাকার মতো স্থানকে নৈশকালীন মার্কেটের সম্ভাব্য এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থায়ী অবকাঠামো নয় : হকার মার্কেটে কোনো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। তবে রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার জন্য অস্থায়ী ছাতা বা আচ্ছাদন ব্যবহার করা যাবে। প্রতিদিন ব্যবসা শেষে এসব সরিয়ে নিতে হবে। প্রতিটি হকার জোনের ৩০ শতাংশ জায়গা নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিমালার মূল লক্ষ্য হিসেবে পথচারী ও যান চলাচল নিশ্চিত করা, হকারদের কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়ন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপদ, পথচারীবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত নগর গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। খসড়াটি বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত হকার ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে নিবন্ধন, নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ের মাধ্যমে হকারদের ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নিবন্ধন ফি ও ভাড়া : এককালীন নিবন্ধন ফি ৫ হাজার টাকা, বাৎসরিক নবায়ন ফি ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং মাসিক স্থান ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ফি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি হকার মাসিক ৩ হাজার টাকা করে দেবেন।
