যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের ওপর যেভাবে দমনপীড়ন চলছে

আন্তর্জাতিক যুক্তরাজ্য

ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় কিংস কলেজ লন্ডন (কেসিএল)। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ২৬ জন শিক্ষার্থী সেখানে ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের শাস্তিমূলক তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন। যুক্তরাজ্যের অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এই সংখ্যা সর্বোচ্চ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং লিবার্টি ইনভেস্টিগেটসের এক যৌথ অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের ১৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্য অধিকার আইনের (এফওআই) আওতায় আবেদন করা হয়েছিল। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় ফিলিস্তিনপন্থী প্রায় ২৩৬ জন শিক্ষার্থী ও স্টাফদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা তদন্ত শুরু করেছে। এই তালিকায় কিংস কলেজের পরেই রয়েছে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (২৪টি মামলা), অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (১৮টি মামলা) এবং কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয় (১২টি মামলা)।

.

প্রতিবেদনে বলা হয়, কিংস কলেজ কর্তৃপক্ষের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে রয়েছে প্রতিরক্ষা শিল্পের (অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান) সাথে তাদের গভীর আর্থিক ও কৌশলগত সম্পর্ক। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা অস্ত্র কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও অনুদান রক্ষা করতে ফিলিস্তিনপন্থী কণ্ঠস্বরকে সুকৌশলে স্তব্ধ করার চেষ্টা করছে। ২০২০ সাল থেকে কিংস কলেজ বিএই সিস্টেমস, থেলস এবং রোলস রয়েসের মতো অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রায় ৩৩ লাখ পাউন্ড (৪৪ লাখ মার্কিন ডলার) গবেষণা তহবিল পেয়েছে। এসব কোম্পানি এমন সব যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ তৈরি করে, যা গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

.

বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা এর আগে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনে জড়িত ও সহযোগী কোম্পানিগুলো থেকে কিংস কলেজের ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল তহবিল প্রত্যাহার বা ডাইভেস্টমেন্টের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আলোচনায় বসার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধে কঠোর আইনি ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়। ফিলিস্তিনপন্থীদের ওপর নজরদারি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থাকে টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল ট্র্যাক করাত বলেও গত এপ্রিলে এক তদন্তে উন্মোচিত হয়।

এমনই এক ভুক্তভোগী ১৮ বছর বয়সী এক নবাগত মুসলিম ছাত্রী (ছদ্মনাম খাদিজা)। তিনি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তার এক শিক্ষকের লিঙ্কডইন প্রোফাইল শেয়ার করেছিলেন, যিনি অতীতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে ৪ বছর কর্মরত ছিলেন। এই অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ক্যাম্পাস থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে, ক্লাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে এবং জোরপূর্বক ২ হাজার শব্দের একটি ‘অনুতপ্ত’ প্রবন্ধ লিখতে বাধ্য করে। এমনকি তাকে যুক্তরাজ্যের বিতর্কিত ‘প্রিভেন্ট’ (কাউন্টারটেররিজম) কর্মসূচিতে পাঠানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

জাতিসংঘের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সমিতি বিষয়ক বিশেষ দূত জিনা রোমেরো কিংস কলেজের এই আচরণকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাস্তিমূলক কাঠামোর এমন অপব্যবহার অত্যন্ত হতাশাজনক।”

যদিও কিংস কলেজের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, তারা বৈধ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বা ফিলিস্তিনপন্থী মতামতের জন্য কাউকে শাস্তি দিচ্ছেন না। কিন্তু কিংস কলেজ স্টুডেন্টস ইউনিয়নের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লুকমান ওয়াকার অভিযোগ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতিবাদ ঠেকাতে এবং শিক্ষার্থীদের মনে ভয় ঢোকাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ‘আরবিট্রেডরি বা খামখেয়ালি তদন্তকে’ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *