ভারতে মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্নে গণহত্যার প্রস্তুতি চলছে

আন্তর্জাতিক

ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিহ্ন করার এক ভয়াবহ ‘গণহত্যার প্রস্তুতি’ চলছে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দেশটির প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা ও তুখোড় সমাজকর্মী প্রকাশ রাজ। তিনি অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং তাদের আদর্শিক অভিভাবক আরএসএস-এর মূল এজেন্ডাই হলো দেশ থেকে মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেওয়া।

সম্প্রতি হায়দরাবাদে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস’ (এপিসিআর) আয়োজিত ‘লঙ্গিং ফর জাস্টিস’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। গত মঙ্গলবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে ভারতজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও টেলিভিশন উপস্থাপক প্রকাশ রাজ তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালায়ালাম, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্রে তার কাজের জন্য সুপরিচিত।

ভারতীয় এই চলচ্চিত্রকার তার ভাষণে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যার মহড়া’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “দেশে যা ঘটছে তা বোঝার চেষ্টা করুন। তারা মুসলিমদের মুছে ফেলতে চায়, তারা আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করতে চায়। এটাই তাদের আসল এজেন্ডা।” ক্ষমতাসীন শক্তির সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, বিজেপি হচ্ছে পানির ওপরে ভেসে থাকা ‘পদ্মফুল’, কিন্তু আসল শক্তি হলো পানির নিচে লুকিয়ে থাকা ‘দানব’ আরএসএস।

ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান দশা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলিউড এই অভিনেতা বলেন, “ভারতের আদালতগুলোর জন্য লজ্জা! আপনারা বিচার ব্যবস্থাকে গলা টিপে হত্যা করে সবচাইতে বড় অপরাধ করছেন।” তিনি অভিযোগ করেন, বিচার বিভাগ সংবিধানের মূল্যবোধ রক্ষায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

গত ২৬ নভেম্বর সংবিধান দিবসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো একটি গণ-ইমেইলকে ‘মিথ্যার ঝুলি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন প্রকাশ রাজ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একদিকে প্রধানমন্ত্রী ড. বি আর আম্বেদকর ও সংবিধানের প্রশংসা করে চিঠি লেখেন, অন্যদিকে রাম মন্দির উদ্বোধনের সময় জাতীয় পতাকার বদলে ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন করেন— এই ব্যক্তির মনে কি সত্যিই জাতীয় পতাকার প্রতি কোনো শ্রদ্ধা আছে? তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, বর্তমান শাসক গোষ্ঠী ভারতের সংবিধান বদলে সেখানে ‘মনুস্মৃতি’ কার্যকর করতে চায়, যার মাধ্যমে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে’ পরিণত করা হবে।

গৌরী লঙ্কেশ ও নরেন্দ্র দাভোলকরের মতো মুক্তমনাদের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, খুনিদের জামিন পাওয়া এবং তাদের বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া ভারতের নৈতিক পতনেরই চরম লক্ষণ। ভাষণের শেষে তিনি এক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “আজ তারা মুসলিমদের জন্য এসেছে, কাল তারা আপনার দরজায় কড়া নাড়বে।”

উল্লেখ্য, যদিও প্রকাশ রাজের এই ভাষণটি গত মাসে দেওয়া হয়েছিল, তবে মঙ্গলবার থেকে এর ছোট ছোট অংশ বা ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি দ্রুত সবার নজরে আসে এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দলটির নেতারা তার মন্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন, উসকানিমূলক ও রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে আখ্যা দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রকাশ রাজের অনুসারীরা তার এই সাহসকে সমর্থন জানিয়ে বাক-স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *