
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে (ইপিএল) খেলা বাংলাদেশি ফুটবলার হামজা দেওয়ান চৌধুরী যেন বদলে দিয়েছেন লাল-সবুজের ক্রীড়াঙ্গন। ইংল্যান্ড থেকে দেশে এসে ভারতের বিপক্ষে এএফসি বাছাই পর্বের অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে শিলং গিয়ে লাল-সবুজ জার্সি গায়ে মাঠ মাতালেন হামজা। জহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে তার অসাধারণ ক্রীড়াশৈলী দেখে বাংলাদেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ জুড়ে গেছে। হামজা লাল-সবুজ জার্সিতে অভিষেক ম্যাচেই জয় করলেন দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়। মূলত হাজমার খেলা এবং তার প্রতি মানুষের নির্ভরতায় মুগ্ধ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। তাই তো তারা ‘হামজা’র মতো প্রবাসী ক্রীড়াবিদদের খোঁজে তাগিদ দিয়েছে দেশের সকল ক্রীড়া ফেডারেশনকে। প্রবাসী খুঁজে এনে দেশের পক্ষে খেলানোর জন্য গতকাল বিভিন্ন ফেডারেশনকে চিঠি দেয় এনএসসি। যেখানে নির্দেশনা দেয়া হয়, বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত প্রবাসী সকল ক্রীড়াবিদরা যাতে লাল-সবুজ জার্সি গায়ে খেলতে পারেন এ ব্যাপারে ফেডারেশনগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এনএসসির সচিব মো. আমিনুল ইসলামের সই করা এমন চিঠি সকল ফেডারেশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বা প্রধান নির্বাহীকে দেওয়া হয়েছে।
ইপ্এিলে লেস্টার সিটির হয়েই সাধারণত খেলে থাকেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার হামজা দেওয়ান চৌধুরী। এখন অবশ্য ধারে তিনি খেলছেন শেফিল্ডের হয়ে। গত ২৫ মার্চ এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে বাংলাদেশের হয়ে তিনি নিজের অভিষেক ম্যাচ খেলেছেন। এছাড়া কানাডা জাতীয় দলে খেলা আরেক প্রবাসী ফুটবলার সামিত সোম স¤প্রতি বাংলাদেশের জার্সিতে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। হামজা বাংলাদেশ দলে যোগ দেয়ার পরই লাল-সবুজ ফুটবলের আবহ বদলে গেছে। দলীয় শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি সর্বত্রই এখন ফুটবল নিয়ে আলোচনা। সামিত সোমও যোগ দিলে বাংলাদেশ দলের মান আরও অনেক বাড়বে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ডেনমার্ক প্রবাসী মিডফিল্ডার জামাল ভূঁইয়া বাংলাদেশ জাতীয় দলে প্রথম খেলেন। সময়ের পরিক্রমায় তিনি বাংলাদেশ দলের অধিনায়কত্ব করছেন অর্ধযুগের বেশি সময় ধরে। জামালকে অনুসরণ করে জাতীয় দলে যুক্ত হয়েছিলেন ফিনল্যান্ড প্রবাসী তারিক কাজী, কানাডা প্রবাসী রাহবার ওয়াহেদ ও সৈয়দ শাহ কাজেম কিরমানী। ফুটবলের মতো অন্য খেলাগুলোতেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ক্রীড়াবিদ অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। প্রবাসী ক্রীড়াবিদদের বাংলাদেশের হয়ে খেলতে হলে পাসপোর্ট, জন্ম নিবন্ধন, বাবা-মায়ের কাগজপত্র হালনাগাদসহ আরও অনেক বিষয়াদির আনুষ্ঠানিকতা থাকে। এই সংক্রান্ত বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য রাজী হয়েছেন বলে এনএসসির চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত আমেরিকান প্রবাসী জিমন্যাস্ট জ্যাক আশিকুল ইসলামের অনুকূলে বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এনএসসি সম্পৃক্ত রয়েছে। ফুটবল ছাড়া অ্যাথলেটিক্স, বক্সিং, জিমন্যাস্টিক্স ও সাঁতারে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ক্রীড়াবিদরা অংশগ্রহণ করেছেন এর আগে। বাংলাদেশের দ্রæততম মানব ইংল্যান্ড প্রবাসী অ্যাথলেট ইমরানুর রহমান এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিক্সে স্বর্ণ জিতেছেন। যা বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাস। ২০১২ সালে আমেরিকান প্রবাসী সাইক সিজার লন্ডন অলিম্পিকে খেলেছিলেন। ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে তিনি আমেরিকান জিমন্যাস্টিক্স দলের সহকারী কোচ ছিলেন। নিউজিল্যান্ড প্রবাসী জিমন্যাস্ট আলী কাদির ২০২২ সালে তুরস্কে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে বাংলাদেশের হয়ে খেলেছিলেন। ২০২৩ হ্যাংজু এশিয়ান গেমসে আমেরিকান প্রবাসী বক্সার জিনাত ফেরদৌস অংশ নিয়েছিলে। যদিও তিনি কাক্সিক্ষত আশা পূরণ করতে পারেননি। ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে লন্ডন প্রবাসী জুনাইনা আহমেদ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে বিভিন্ন খেলায় প্রবাসী ক্রীড়াবিদ অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নেতিবাচক অনেক খবরও ছিল। প্রবাসী ক্রীড়াবিদ এনে অনেক ক্রীড়া সংগঠকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলেরও অভিযোগ আছে। ২০১৭ সালে আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে খেলানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নারী লংজাম্পার আলিদা শিকদারকে দলভ ুক্ত করেছিলেন বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রকিব মন্টু। তবে আলিদা বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন বাকুতে প্রতিযোগিতায় অংশ না নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়ে। এত দিন কয়েকটি ফেডারেশন নিজেদের উদ্যোগে এবং কর্মকর্তাদের পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রবাসী ক্রীড়াবিদ এনেছিল জাতীয় দলে খেলানোর জন্য। তবে এই প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে ফেডারেশনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত মেধাবী ক্রীড়াবিদদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তির জন্য। সরকারের এই নির্দেশে সুবিধাবাদী কিছু ক্রীড়া সংগঠক সুযোগ নিতে পারেন বলেও মনে করছেন দেশের ক্রীড়াবোদ্ধারা। এ জন্য এনএসসির একটি নীতমালা তৈরি করে দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন তারা। তা নাহলে নিজেদের প্রবাসী আত্মীয়-স্বজনকে লাল-সবুজ জার্সি পরাতে উঠেপড়ে লাগবেন অনেক সংগঠক।
এ বিষয়ে নীতিমালা তৈরির কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা? এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ্এনএসসির সচিব মো. আমিনুল ইসলাম বলেন,অতীতে এমন হয়ে থাকলে সেটা দুঃখজনক। তাহলে আমাদের যে ভালো একটা উদ্যোগ সেটা সফল হবে না। যে কারণে, এ বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। নীতিমালার প্রসঙ্গ তুলেছেন, এটা দারুণ একটা আইডিয়া। আমরা অবশ্যই একটা নীতিমালা তৈরি করবো। একটা কমিটিও গঠন করে দেবো। যাতে চাইলেই যাকে খুশি জাতীয় দলে খেলানোর সুযোগ না থাকে। প্রবাসী ক্রীড়াবিদদের যে নামগুলো পাওয়া যাবে তাদের যোগ্যতা খতিয়ে দেখবে ওই কমিটি। তারর্প চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
