
সাম্প্র্রতিক অতীতে জুলাই বিপ্লব-বিরোধী কিছু অশুভ তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে যেগুলো দেখে মনে হচ্ছে, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো ২০০৬ সালে ওয়ান-ইলেভেনের মতো কুখ্যাত গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী ঘটনা সংঘটনে যে অনুঘটকের ভ‚মিকা নিয়েছিল এখন আবার আরেকটি ওয়ান-ইলেভেন সংঘটনে অনুরূপ ভ‚মিকা নিচ্ছে বলে সে দিনই অভিযোগ উঠেছিল। তখন যেমন স্টার ও আলোর দেশি-বিদেশি আরো চক্র জড়িত ছিল বলে কলামিস্ট এবং বøগাররা অভিযোগ করছেন, তেমনি এবারও দেশি-বিদেশি চক্র জড়িতের আলামত পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েক দিনের ঘটনাবলি দেখে মনে হচ্ছে, এদের বিদেশি মেন্টর ভারতীয়দের এখন প্রধান অ্যাজেন্ডা হলো যেকোনো মূল্যে আগামী ফেব্রæয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন বানচাল করা। কারণ যদি কোনোভাবে ফেব্রæয়ারির নির্বাচনটি হয়ে যায় এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসে তাহলে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য ভারত এবং আওয়ামী লীগের সমস্ত চক্রান্ত ধূলিস্যাৎ হবে।
গত ১০ অগাস্ট রোববার বিচার বিভাগের কলঙ্ক খায়রুল হকের মতো এক ব্যক্তির জামিনকে কেন্দ্র করে আদালতে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের সাথে ধাক্কাধাক্কি করেছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। জেড আই খান পান্নার মতো অ্যাডভোকেট, যিনি ‘মঞ্চ-৭১’ বানিয়ে ১৫ আগস্ট শোক পালনের জন্য ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে যাওয়ার আহŸান জানিয়েছেন, তিনি খায়রুল হকের পক্ষে আইনি লড়াই করার জন্য আবেদন করেছেন। তবে আদালতকে ধন্যবাদ, আইনি যুক্তি দিয়ে ওই আবেদন নাকচ করা হয়েছে। কিন্তু এটিকে কেন্দ্র করে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দিকে তেড়ে এলে উভয় পক্ষে ধাক্কাধাক্কি হয় এবং পরে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা পিছু হটে।
একটি জাতীয় বাংলা দৈনিকের ১২ আগস্ট মঙ্গলবারের খবরে প্রকাশ, ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে রাতের আঁধারে খুলনার দেয়াল ও খুঁটিতে পোস্টার সাঁটাচ্ছে আ.লীগ। নগরীর খালিশপুর ও খানজাহান আলী থানা এলাকায় সোমবার রাতে এসব পোস্টার সাঁটানো হয়। খুশির বিষয়Ñ শেখ মুজিব, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ কামাল প্রমুখের ছবি ওই পোস্টারে থাকলেও জনতার কোনো সহানুভ‚তি উদ্রেগ করেনি। পক্ষান্তরে জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে এসব পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে।
চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলায় একজন উপপরিদর্শক আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সোমবার গভীর রাতে মহানগরীর বন্দর থানা এলাকার সল্টগোলা ক্রসিংয়ের ইশান মিস্ত্রি হাট সংলগ্ন সড়কে ওই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে আওয়ামী লীগের ১৮ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মহানগরীর বন্দর থানা পুলিশ জানায়, সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে আওয়ামী লীগের একটি মিছিলের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। তাদের হামলায় উপপরিদর্শক আবু সাঈদ রানা মাথায় ও হাতে গুরুতর জখম হন। তাকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনার পর পুলিশ ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ১৮ জনকে গ্রেফতার করে।
এদিকে আওয়ামী লীগের মিছিলের খবর শুনে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বিএনপি নেতাকর্মীরা। তারা বলেন, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা এখনো বিভিন্ন জায়গায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। এসব সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে মিছিল করার সাহস দেখাচ্ছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত সবাইকে অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানান তারা।
সুখের বিষয়Ñ দেশের বৃহত্তম দল বিএনপি নেতাকর্মীরা খবর শুনেই অকুস্থলে উপস্থিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোত্থেকে পাচ্ছে পতিত আওয়ামী লীগ এই দুঃসাহস? আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মারা যে বর্তমান সরকারের মধ্যেই ঘাপটি মেরে আছে তার একটি প্রমাণ পাওয়া গেছে গত ১৩ আগস্ট বুধবার একটি বাংলা জাতীয় দৈনিকের খবরে।
যখন বাংলাদেশের কারেন্সি থেকে শেখ মুজিবের ছবি অপসারণ করা হয়েছে, যখন দেশে ১০ হাজার মুজিবের মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়েছে, যখন শেখ মুজিবের ৩২ নম্বরের বাড়ি জনতার রুদ্ররোষে ভেঙে খান খান হয়ে গেছে তখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) নির্বাহী কমিটির টেবিলে উঠে এসেছে সরকারি ব্যয়ে শেখ মুজিবের ভাস্কর্য নির্মাণের একটি প্রকল্প। জনাব ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ পরিকল্পনা উপদেষ্টা। অথচ তার মন্ত্রণালয় থেকেই তার অধীনস্থ আমলারা সাত কোটি টাকা ব্যয়ে শেখ মুজিবের ভাস্কর্য নির্মাণের একটি প্রকল্প একনেকের সভায় উত্থাপন করতে যাচ্ছে। বিষয়টি উপদেষ্টার নজরে আনলে তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে বলেছেন।
দেশের রাজনীতি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ সচেতন ব্যক্তিরাও লক্ষ করছেন, বিগত এক মাসে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বিশেষ করে টকশোতে এক শ্রেণির আলোচক সম্পূর্ণ ইউটার্ন মেরেছেন। দুই মাস আগেও এরা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের পিÐি শ্রাদ্ধ করতেন। অন্তত পাঁচজন আলোচক, যারা বাংলাদেশে বাস করেন, তারা প্রথমে ইউনূস সরকারের সমালোচনা শুরু করেন। এই সমালোচনাকে অন্যেরা প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলেন। কারণ ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার আর কিছু করুক আর নাই করুক, মতামত প্রকাশের অবারিত স্বাধীনতা দিয়েছেন। এই স্বাধীনতা এতই অবারিত যে, সেটি গণতান্ত্রিক রীতিতেও সীমালঙ্ঘন করছে। উদাহরণ স্বরূপ, তারা সেনাবাহিনী বিশেষ করে সেনাপ্রধানেরও সমালোচনা করছেন।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদারতার সুযোগ নিয়ে ওই চিহ্নিত আলোচকরা অপ্রাসঙ্গিকভাবে পতিত সরকারকে টেনে আনছেন এবং আকার-ইঙ্গিতে বোঝাতে চাচ্ছেন, আগেই আমরা ভালো ছিলাম। কেউ কেউ সরকারের সরলতার সুযোগ নিয়ে শাহ আব্দুল করিমের সেই গান ধরেছেন, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’।
দেখা যাচ্ছে, এরা দিনে দিনে ভারী হচ্ছেন। এদের সাথে যুক্ত হচ্ছেন ভার্সিটির কিছু শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, জেড আই খান, মহসিন রশিদের মতো আইনজীবী প্রমুখ। এসবের সাথে যদি আমরা মাহফুজ আনামদের বক্তব্য যোগ করি তাহলে দেখা যাবে, সব রসুনের গোড়া এক। ওরা বলছেন, এই সরকারের ঘোষণাপত্রে ১৯৫২ সালে পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং শহীদ দিবসের কথা নেই। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের কথাও নেই। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কথা নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা নেই। ঘোষণাপত্রে শেখ মুজিবের নাম একবারও উল্লেখ করা হয়নি। আরো অভিযোগ করা হয়েছে, ‘মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করা কোনোভাবেই গ্রহণ করা হবে না’।
এসব প্রত্যেকটি কথার দাঁতভাঙা জবাব মানুষের কাছে আছে। কিন্তু তার আগে ওরা জবাব দিন, ওরা যে ফখরুদ্দিন, মঈনউদ্দিনের শাসন এনেছিলেন, ওদের সেই শাসন জনাব তারেক রহমানকে ওপর থেকে ফেলে দিয়ে তার মেরুদÐের হাড় ভেঙেছিল। ওরা কি তার প্রতিবাদে একটি শব্দও উচ্চারণ করেছেন? ওদের ওয়ান-ইলেভেন সরকারই তো ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতায় এনেছিল। আর শেখ হাসিনাই দেশের অবিসংবাদিত নেত্রী, যাকে কোনোরকম দুর্নীতি স্পর্শ করতে পারেনি, সেই নেত্রীকে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের ডাহা মিথ্যা অভিযোগে জেল দিয়েছিল।
ওই অভিযোগটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা, সে কারণেই বর্তমান সুপ্রিম কোর্ট বেগম জিয়ার ওই মিথ্যা মামলা খারিজ করে তাকে সসম্মানে তার স্থানে তাকে অধিষ্ঠিত করেছেন। ওরা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধকে নাকি খাটো করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে ওরা যে ইংরেজি শব্দটি ব্যবহার করেছেন সেটি হলো উবহরমৎধঃব. মুক্তিযুদ্ধকে কোথায় খাটো করা হলো সেটি ওরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাক; বরং ওরা এবং তাদের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় কর্মরত অ্যাক্টিভিস্টরা মুক্তিযুদ্ধকে অনাবশ্যকভাবে জুলাই বিপ্লবের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছেন।
ওরা ৭৩ বছর আগের ভাষা আন্দোলনের কথা বলছেন। কিন্তু ১৬ বছর আগের বিডিআর ম্যাসাকার ও শাপলা চত্বরে আলেম-ওলামাদের এত বড় গণহত্যা ওদের নজর এড়িয়ে যায়।
বলা হচ্ছে, শেখ মুজিবের নাম একবারও নেয়া হয়নি। নেয়া হয়নি তো ভাসানী, শেরে বাংলা এবং সোহরাওয়ার্দীর নাম। শেখ মুজিব তো কোনোদিন মুখ ফুটে স্বাধীনতার কথা বলেননি। কিন্তু মওলানা ভাসানী ১৯৭০ সালের নির্বাচনের অনেক আগে স্বাধীন পূর্ববাংলার আওয়াজ তুলেছিলেন। ১৯৭০ সালের বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের পর মওলানা ভাসানী ¯েøাগান দিয়েছিলেন, ‘স্বাধীন পূর্বপাকিস্তান জিন্দাবাদ’। সংবিধান সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের ২২ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ভাসানীর প্রতিটি সভাতেই উড়ানো হতো স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার পতাকা।’
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে বলেছিলেন, ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মিল দুই বাংলার মানুষকে একদিন আবার কাছাকাছি নিয়ে আসবে, যদিও রাজনৈতিক বিভক্তি থাকবে।
পক্ষান্তরে শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১০টা ৪০ মিনিটে নিজ গৃহ থেকে পাক বাহিনীর হাতে বন্দি হন। সোজা কথা, মুক্তিযুদ্ধের সাথে তার কোনো সংশ্রবই ছিল না।
১৯৭০ সালের নির্বাচন? তাহলে কিন্তু প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাবে। ওরা তো পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান ওরা কোনো অথোরিটিতে প্রণয়ন করেন? এ বিষয়টি অন্য কোনো সময় আলোচনা করা যাবে।
*মোবায়েদুর রহমান*
