তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন চায় না জামায়াত!

প্রচ্ছদ

পঞ্চম দিনে গড়ালো আপিল শুনানি, ভারত-বন্দনায় ‘হিন্দু সম্মেলন’

আগামী ফেব্রুয়ারিতে যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে, তখন বাধাগ্রস্ত করতে একের পর এক বিষলক্ষার ছুরি হানছে ‘ইসলাম’ শব্দ যুক্ত দল জামায়াত। পিআর পদ্ধতি মাঠে মারা যাওয়ার পর ধুয়া তোলে নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠানের। রাজপথে, মেঠো আলোচনা, ঘরোয়া বৈঠক, বক্তৃতা-বিবৃতি, জাতীয় ঐকমত্যের সংলাপÑ সর্বত্রই দলটি তোলে এই রব। এতেও যখন ‘কাজ’ হয়নি তখন সর্বোচ্চ আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে প্রয়াস চালাচ্ছে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার।

একদিকে ভারতীয় কৃপাদৃষ্টির লোভে জামায়াত-আওয়ামী তরিকায় ইসকন বন্ধনা করছে। ভারতকে খুশি করতে ‘সনাতন শাখা’র উদ্যোগে ‘হিন্দু সম্মেলন’ করছে। আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনার ডুমুরিয়ায় করছে এ সম্মেলন। যেখানে প্রধান অতিথি জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরোয়ার। বিশেষ অতিথি করা হয়েছে ইসকন নেতাদের। অ্যাডভোকেট গোবিন্দ প্রামাণিকের ‘হিন্দু মহাজোটের’ সঙ্গে গড়ছে ভোটের জোট। অন্যদিকে ‘গণভোট গণভোট’ বলে জাতীয় নির্বাচনের আগে ফ্যাকড়া বাঁধানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, যা হাসিনার ভারত-বন্দনাকেও হার মানাচ্ছে। দলটি আপাত: নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে-মর্মে লোক দেখানোর চেষ্টা করলেও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বলছে গণভোটের কথা, সংস্কারের কথা। একই সঙ্গে চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রলম্বিত করার প্রয়াস। একই যোগসূত্রে গেঁথে কেযারটেকার পুনর্জীবিতকরণ-সংক্রান্ত রিভিউ শুনানিতে ছাড়ছে পরবর্তী সংসদ দ্বারা সংশোধন করে কার্যকর করার নতুন তত্ত্ব, যা হাসিনার তরিকায় নির্বাচনবিহীন সরকারকে প্রলম্বিত করার পরিলক্ষণ মাত্র। কেয়ারটেকার সরকার-সংক্রান্ত রিভিউ পিটিশনের শুনানি পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে। সেই শুনানিতে আপিল বিভাগে জামায়াতের চাতুর্যপূর্ণ উপস্থাপনাকে আপাত: কেয়ারটেকার সরকারের পক্ষে বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার কেযারটেকার সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলÑ সেই কৃতিত্ব ঢেকে দেয়ার চেষ্টাও পরিলক্ষিত করছে। ৩৬ বছর আগে কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থাকে ‘জামায়াতের চিন্তা’ বলে দাবি করার মধ্যদিয়ে নিচ্ছে কৃতিত্ব। অথচ হাসিনা ফ্যাসিবাদ কায়েমের জন্য যখন কেযারটেকার ব্যবস্থাকে সংবিধান থেকে ‘নাই’ করে দিয়েছিল তখন জামায়াত চুপ করে ছিল। কেয়ারটেকারের ঝা-া উড়িয়ে এককভাবে লড়াই করতে দেখা গেছে বিএনপিকেই।

গতকাল মঙ্গলবার কেয়ারটেকার সরকার পুনর্জীবিতকরণ-সংক্রান্ত রিভিউর চতুর্থ দিনের মতো শুনানি হয়। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগীয় বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ করছেন। গতকাল শুনানি করেন জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরোয়ারের পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে তিনি বক্তব্য উপস্থাপন শুরু করেন। আদালত পরে পরবর্তী শুনানির জন্য আজ (বুধবার) তারিখ ধার্য করেন। আজ পঞ্চম দিনের মতো রিভিউ পিটিশনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

গতকাল আদালত থেকে বেরিয়ে জামায়াত নেতা, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজন করা সম্ভব নয়! তিনি দাবি করেন, সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কথা বলা আছে। এখন তো কোনো সংসদ নেই। সংসদ ভেঙে গেছে এক বছরের বেশি সময় আগে। এখন দেশ চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ ছাড়া ‘আরো কিছু বিষয়’ রয়েছে। এ কারণে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও আসন্ন নির্বাচনে এটি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধানে অ্যালাউ হয়ে পুনর্জীবন হলেও বাস্তবে এটি কার্যকর করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। কারণ আমরা এখন যে সিস্টেমের মধ্যে আছি সেই সিস্টেমে সংবিধানের পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদ ৫৮ ক, খ, গ, ঘ যে পরিস্থিতিতে এটি অ্যাপ্লাই করতে হয় সেই সিচুয়েশন এখন নেই। এটি যদি অ্যাপ্লাই করতে হয় তাহলে এটি ডরমেন্ট থাকবে। যখন এই পরিস্থিতি হয় তখন পরিস্থিতি সাপেক্ষে অ্যাপ্লাই করতে হবে। এখন কোনো পার্লামেন্ট নেই। তাই পার্লামেন্ট ভাঙারও প্রশ্ন আসছে না। পার্লামেন্টই যদি না ভাঙে তাহলে কেযারটেকার সরকার কি করে হবে? যে অন্তর্বর্তী সরকার আছে এটিই কন্টিনিউ করবে। এটির তিনটি ম্যান্টেট আছে। একটি বিচার, একটি সংস্কার ও একটি নির্বাচন। আমরা বলেছি, এই তিনটি সংস্কারের ভিত্তিতেই বর্তমান সরকার তার অরিজিনাল ফর্মে কন্টিনিউ করবে। নতুন পার্লামেন্ট হবে। নতুন পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের যদি আগের কেয়ারটেকার সরকার আগের মতোই থেকে যায় অথবা নতুন করে জুলাই চার্টারে উল্লিখিত কোনো ম্যাকানিজমকে ইন্ট্রোডিউস করা হয়, সেই সিস্টেমে পরবর্তী কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট সৃষ্টি হবে। এখানে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, জটিলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য থেকেই এই আইনজীবী পরবর্তী সংসদ কর্তৃক কেয়ারটেকার ব্যবস্থা পুনর্জীবনের কথা বলছেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বহু আগে থেকেই বলে আসছেন, রায়ের মাধ্যমে পুনর্জীবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। যেহেতু সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্ডাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সেহেতু এ সরকারই কেয়ারটেকার সরকার হিসেবে পারফর্ম করবে। সেক্ষেত্রে আপিল বিভাগের একটি নির্দেশনা প্রয়োজন হবে।

সরকারপক্ষে আপিল বিভাগে শুনানি করছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। কবে থেকে কেয়ারটেকার কার্যকর হবেÑ এ প্রশ্নের জবাবে তিনিও বলছেন, নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হবেÑ এ বিষয়ে আপিল বিভাগ চাইলে নতুন করে পর্যবেক্ষণ দিতে পারেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেমন সাংবিধানিক পরিকাঠামোর মধ্যে আছে, একইভাবে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কখন থেকে কার্যকর করবেন সে গাইডলাইন প্রদানের। আমরা শুনানিতে আদালতে বলেছি যে, আপনাদের সামনে যখন রিভিউ আছে। তার মাধ্যমে আপনারা যেকোনো প্রশ্নের মীমাংসা দিতে পারেন। অন্তর্বর্তী সরকার তার মতো করে তার স্কিম ফুলফিল করবে। আমরা বিশ্বাস করি, সুপ্রিম কোর্ট সবকিছুকে বিবেচনায় নিয়ে একটা গাইডলাইন দেবেন।

রিটকারি ড. বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী ড. শরীফ ভুঁইয়াও তৃতীয় দিনের শুনানিতে বলেছেন, হাইকোর্ট থেকে আপিল বিভাগ পর্যন্ত মোট ১২ জন বিচারপতি এ মামলাটি শুনেছেন। তাদের মধ্যে ৮ জনই তা (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) রাখার পক্ষে মত দেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ চারজন তা বাতিল করতে বলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আপিল বিভাগ একটি গাইডলাইন করে দিতে পারেন।
পক্ষান্তরে, জামায়াতের আইনজীবী বাজাচ্ছেন পুরোনো ভেরেন্ডা। তিনি গণভোট চাইছেন। রায়ে কোনো অবজারভেশন চাইছেন না। তিনি বলছেন, আদালতের উচিত আমাদের আপিলটাকে অ্যালাউ করা। কেয়ারটেকার সরকারকে রিস্টোর করা (পুনর্জীবিতকরণ) উচিত। কিন্তু এর সঙ্গে কোনো অবজারভেশন দেয়া উচিত নয়। যেহেতু একটি বৃহত্তর সংস্কার-প্রক্রিয়া চলমান। জুলাই চার্টার হয়েছে। আদেশ হবে। গণভোট হবে এবং পরবর্তী পার্লামেন্টে এ নিয়ে আলোচনা হবে। এজন্য একে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক সুনির্দিষ্ট কোনো অবজারভেশন থাকা উচিত নয়। বরং আপিলটা অ্যালাউ হবে কি না, নিষ্পত্তি হবে কি-নাÑ এটিই হওয়া উচিত আপিল বিভাগের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। এখানে যদি বাড়তি কোনো অবজারভেশন থাকে, ডাইরেকশন থাকে, তাহলে ইতোমধ্যে গৃহীত জুলাই চার্টার এবং পার্লামেন্টে উপস্থাপিত যে প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলো গ্রহণ করেছে সেই বৃহত্তর সংস্কার-প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনেতিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীল গত ২১ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ এ রূপ দেয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচন অর্থবহ, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য এই মুহূর্ত থেকে যেটা প্রয়োজন, তা হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এখন ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’র আদলে নিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলতে যা বোঝায় সেই ভূমিকায় তাদের যেতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *