চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধ

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকালে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার উস্কানি তথা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় শা.বি.’র সাবেক অধ্যাপক ড.জাফর ইকবাল, ঢাবি’র তৎকালিন ভিসি এএসএম মাকসুদ কামালহ ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দিয়েছে প্রসিকিউশন।
গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাাম্মদ আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালিন ভিসি এএসএম মাকসুদ কামালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা। প্রতিবেদনটি যাচাই-বাছাই শেষে শিগগিরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে।
অন্য আসামিরা হলেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান, স্কাইপি কেলেঙ্কারির কারিগর বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ.ক.ম জামাল উদ্দিন ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
প্রসিকিউশন জানায়, এ ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করে তদন্ত সংস্থা। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। বর্তমানে তা পর্যালোচনা চলছে। এরপর ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হবে।
.
প্রসঙ্গত: জুলাই অভ্যুত্থানকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসিনা অনুগত ভিসি ড.এএসএম মাকসুদ কামাল বলপ্রয়োগ করে ছাত্রদের দমনের পক্ষে অবস্থান নেন। ছাত্রলীগের ক্রমাগত সন্ত্রাস, বর্বরতার প্রেক্ষাপটে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কোনোর ধরণের নিরাপত্তা দিতে পারবেন না-মর্মে জানান। অভ্যুত্থান চলাকালে শিক্ষার্থীদের দমনে ঢাবি ক্যাম্পাসে ড. মাকসুদ কামাল বহিরাগত সন্ত্রাসীদের ক্যাম্পাসের ভেতর ডেকে এনেছিলেন। ভিসি নেতৃত্বাধীন প্রক্টোরিয়াল বডি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। তৎকালিন ভিসি’র প্রত্যক্ষ মদদে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নৃশংস হামলা চালায়।
হাসিনার ক্ষমতার মসনদ রক্ষার্থে তিনি কতটা মরিয়া ছিলেন সেটির প্রমাণ মেলে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই হাসিনা বনাম মাকসুদ কামাল মধ্যকার টেলিফোন সংলাপে। টেলিফোনের অডিও ক্লিপটি ট্রাইব্যুনালে শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা ও দমনের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
.
অন্যদিকে কথিত ‘শিক্ষাবিদ’ ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল আওয়ামী বুদ্ধিজীবী হিসেবে হাসিনার পুরো ফ্যাসিবাদী জমানা জুড়ে আলেম-ওলামাদের ওপর বর্ববর নিপীড়নের বৈধতা উৎপাদন করেন। এ ধারাবাহিকতায় চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমালোচনা করেন। এমনকি হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে গালাগাল করলে জাফর ইকবাল হাসিনার পক্ষ নেন। আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেয়া শ্লোগান ‘আমি কে তুমি কে-রাজাকার রাজাকার/ কে বলে, কে বলেছে- স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ এই শ্লোগানকে কটাক্ষ করেন। এ বিষয়ে তিনি নিজের ওয়েবসাইটে হাতে লেখা একটি নোট প্রকাশ করেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দেখলে আমার মনে শঙ্কা জাগতো যে তারা হয়তো রাজাকার’। হ্যান্ডনোটে তিনি লেখেন, ‘ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের রাজাকার বলে শ্লোগান দেয় সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢা.বি.)র ক্যাম্পাসে আমি আর যেতে চাই না। তার এ মন্তব্য তখন শিক্ষার্থী এবং সাধারণ জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার করে। ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের বর্বোরিচত হামলা, নির্যাতন এবং শেখ হাসিনার বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদনা করে তিনি বরং শেখ হাসিনার নিপীড়নমূলক সিদ্ধান্ত এবং ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যা পরিচালনার পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করে।
এ ছাড়া বিতর্কিত বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ছিলেন আওয়ামী ধব্জাধারী এক বিচারক। যিনি স্কাইপি কেলেঙ্কারির প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের পদ ছাড়তে হয় হাসিনার শাসনামলেই। স্কাইপ কেলেঙ্কারিতে উঠে আসে নিজামুল হক নাসিম তখন কীভাবে সরকার দ্বারা আদিষ্ট হয়ে রায় দিতেন। তা সত্বেও তাকে আনুগত্যের ভিত্তিতে আপিল বিভাগের বিচারপতি নিয়োগ করা হয়। পরবর্তীতে অবসরের পর তাকে প্রেসকাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় আওয়ামী সরকার।
