ছাত্রদলের মর্যাদার লড়াই ঘাঁটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া শিবির

জাতীয় শিরোনাম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের জন্য এখন মর্যাদার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাত্রদল সমর্থিত সাজ্জাদ-শাফায়েত-তৌফিক প্যানেলের প্রার্থীরা ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, নিজেদের ঘাঁটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। শিবির সমর্থিত সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোটের ইবরাহীম-সাইফ-সাজ্জাদ প্যানেলের প্রার্থীরাও প্রচারে ব্যস্ত। আগামী ১৫ অক্টোবর ভোটের দিনকে সামনে রেখে পাহাড় ঘেরা সবুজ ক্যাম্পাস চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবারের চাকসু নির্বাচনে ১২টি প্যানেল থাকলেও, হাড্ডাহাড্ডি ভোটের লড়াই হবে মূলত ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের প্যানেলের মধ্যে।

আর তাই নির্বাচনে ২৭ হাজার ৬৩৪ জন ভোটার থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সারা দেশবাসীর দৃষ্টি এখন এই দুটি প্যানেলের দিকে। বিএনপি-জামায়াতের হাইকমান্ডও সতর্ক চাকসু নির্বাচন নিয়ে। দেশের প্রধান দুই বড় রাজনৈতিক দলের এই দুটি ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীরাও ভোটারদের মন জয় করে নিজেদের বিজয় নিশ্চিতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনেও জমজমাট ভোটের প্রচার চালিয়েছেন প্রার্থীরা। চাকসু ও হল সংসদের মোট ৯০৮ জন প্রার্থীর সবাই ভোটারের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, চাইছেন সমর্থন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতারা বলছেন, এবারের চাকসু নির্বাচনে তাদের জন্য মর্যাদার লড়াই। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি। ছাত্র সংগঠন হিসাবে ছাত্রদলও সাধারণ ছাত্রদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতি বরাবরই ছিল পরিচ্ছন্ন এবং শিক্ষার্থী বান্ধব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে কোন সন্ত্রাসের অভিযোগ নেই। বরং বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ক্যাম্পাসে মোহাম্মদ মুসার মতো জনপ্রিয় ছাত্রদল নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। ওই খুনের জন্য ছাত্রশিবিরকে দায়ী করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ছাত্রলীগের দলীয় কোন্দলে যেখানে প্রতিনিয়ত ক্যাম্পাসে রক্ত ঝড়েছে, সেখানে বিএনপির সময়ে ছাত্রদলের ভূমিকা ছিল শান্তিপূর্ণ। তারা সব সময় সহঅবস্থানের রাজনীতি করেছে। শুধু তাই নয়, দল ক্ষমতায় থাকাকালেও তারা শিবিরের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন তারা।

ছাত্রদল নেতারা বলছেন, বিগত চার দশকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল মজলুম হিসাবে আছে। এই দীর্ঘ সময়ে কখনো ছাত্রলীগ, কখনো ছাত্রশিবির ছাত্রদলের ওপর জালিমের ভূমিকায় ছিলো। ওই দুুটি ছাত্র সংগঠনের হাতেই ছাত্রদলের কর্মী, সমর্থকেরা নির্যাতিত, নিগৃহীত হয়েছেন। এবারের চাকসু নির্বাচনের প্রচারে ছাত্রদল প্রার্থীরা তাদের সেই ক্লিন ইমেজ তুলে ধরছেন। বিগত দিনে ক্যাম্পাসে এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে জুলুম নির্যাতনের ঘটনাও শিক্ষার্থীদের সামনে আনছেন ছাত্রদলের প্রার্থীরা। ছাত্রদলের প্যানেলে যারা প্রার্থী তাদের অনেকে জুলাই যোদ্ধা।
এবার যাদের প্রার্থী করা হয়েছে তারাও ক্যাম্পাসে খুব জনপ্রিয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও কোন প্রশ্ন নেই। ছাত্রদলের প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে প্রার্থী হয়েছেন দর্শন বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন হৃদয়। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের স্পোর্টস সাইন্স শিক্ষার্থী মো. শাফায়াত। এছাড়া সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ভোটে লড়ছেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের আইয়ুবুর রহমান তৌফিক।

সর্বশেষ ১৯৯০ সালের চাকসু নির্বাচনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের প্যানেলে এজিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন বর্তমানে বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম। ছাত্রদল নেতাদের প্রত্যাশা এবারের নির্বাচনে তাদের প্যানেল শিক্ষার্থীদের মন জয় করতে পারবে। ছাত্রদলের প্যানেলকেই শিক্ষার্থীরা বেছে নেবেন।
এদিকে, ছাত্রশিবিরও তাদের বিজয় ছিনিয়ে আনতে মাঠে রয়েছে। ডাকসু এবং জাকসুতে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের বিজয়ে শিবিরের কর্মী সমর্থকেরা উজ্জীবিত। তবে চাকসুতে ছাত্রদলসহ আরো বেশ কয়েকটি প্যানেল মাঠে শক্ত অবস্থানে থাকায় তাদের মধ্যে বিজয় নিয়ে কিছুটা শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের ঘাঁটি হিসেবে দেখে। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শিবিরের জন্মের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় ১৯৮১ সালের চাকসু নির্বাচনে শিবিরের জসিম-গাফ্ফার-ফারুক পরিষদ বিরাট বিজয় অর্জন করে। মূলত ওই নির্বাচনের পর থেকেই চট্টগ্রামে শিবিরের উত্থান ঘটে।

এরপর ১৯৯০ সালের চাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরকে প্রতিহত করতে ছাত্রদল, ছাত্রলীগসহ দেশের ১২টি ছাত্র সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে প্যানেল ঘোষণা করে। সেবারের নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে শিবির পরাজিত হয়। তবে চাকসুতে বিজয়ী হয়ে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য ক্যাম্পাসে কোন কর্মকা- পরিচালনা করতে পারেনি। শিবিরের বাধার মুখে ওই চাকসু অকার্যকর হয়ে যায়। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে তাদের আধিপত্য বজায় রাখে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের কারণে তারা ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়।

জুলাই বিপ্লবের পর তারা ফের ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। এবারের চাকসু নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শিবির তাদের ঘাঁটি ফিরে পেতে চায়। তবে ছাত্রশিবিরের নেতাদের বিরুদ্ধে মেধার বদলে বিশেষ ব্যবস্থায় হলে থাকার অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে হল সংসদে শিবিরের যেসব নেতা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হাতে শিবিরের অনেকে নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। তবে এই ক্যাম্পাসে ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজের কুখ্যাত সন্ত্রাসী হামিদ বাহিনীর প্রধান হামিদের কব্জি কেটে নেওয়ার মধ্যদিয়ে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে রগ কাটার অভিযোগের সূচনা হয়। সেই কলঙ্ক এখনও শিবিরকে বহন করতে হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে সে সব বিষয়ও ঘুরে ফিরে আলোচনায় আসছে। ছাত্রশিবিরের ভিপি প্রার্থী নিয়েও শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম মহানগরী শিবিরের সভাপতি। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের কাছে তার তেমন পরিচিতি নেই। এরপরও শিবিরের প্রার্থীরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদি। সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট নামে সাধারণ পূর্ণাঙ্গ প্যানেল নিয়ে মাঠে নেমেছে ছাত্রশিবির। তাদের প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী হয়েছেন ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস বিভাগের ইব্রাহীম হোসেন রনি। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে রয়েছেন ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রশিবিরের সাহিত্য ও মানবাধিকার সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে আছেন সাজ্জাদ হোসাইন মুন্না।

এদিকে চাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের আট দফা ইশতেহার শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। ইশতেহারে ছাত্রদল নেতারা শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ার অঙ্গীকার করেছেন। ইশতেহারে বলা হয়- শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হবে। মানসম্মত খাদ্য ও আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা প্রদান, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস ও নারীস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ- এসব বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এছাড়া পরিবহন ব্যবস্থার মানোন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, ক্যারিয়ার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে প্যানেলটি।
ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, শিক্ষার্থীরা আমাদের ইশতেহার ভালোভাবে নিয়েছে। আমরা ইশতেহার তৈরির আগে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়েছি, তাদের চাহিদা ও ভাবনা শুনেছি। সেই বাস্তবতার আলোকে আট দফা ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাবনাই আমাদের ইশতেহার, আর সেটি বাস্তবায়নে আমরা সর্বাত্মকভাবে কাজ করব।

অপরদিকে, ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ ১২ মাসের কর্মপরিকল্পনা হিসেবে ৩৩ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহারে বলা হয়, আবাসন সংকট নিরসন ও উন্নয়ন, শাটলের সংখ্যা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন, নিরাপদ বাস সার্ভিস, সুলভ মূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিতকরণ, সেশনজট নিরসন, কটেজ-মেসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের সুবিধা বৃদ্ধি, নিয়মিত চাকসু নির্বাচন, ফ্যাসিবাদমুক্ত ক্যাম্পাস গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ-এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শিবির ৩৩ দফা ইশতেহারের মধ্যে নয়টি ফোকাস পয়েন্ট নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো- আবাসন, যাতায়াত, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, নিরাপদ ও গ্রিন ক্যাম্পাস, সেশনজট, অটোমেশন, শিক্ষা-গবেষণা ও ক্যারিয়ার, নারীবান্ধব ক্যাম্পাস এবং ওয়েলফেয়ার কার্যক্রম।
এই বিষয়ে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ইব্রাহিম রনি বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যা ও প্রত্যাশাগুলো ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করেছি। ১২ মাসে ৩৩টি দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করব। তবে নয়টি ফোকাস পয়েন্টকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেব আমরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *