
দক্ষিণ এশিয়ার আকাশসীমায় সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের বিমান বাহিনীর দীর্ঘদিনের আধিপত্য ও ‘রাফাল’ ফাইটারের শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পাকিস্তান বিমান বাহিনী (পিএএফ) চীন থেকে প্রায় ৪০টি পঞ্চম প্রজন্মের ‘জে-৩৫এ’ (J-35A) স্টিলথ যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়ায় অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক বিমান চালনার ইতিহাসে এটি অন্যতম একটি যুগান্তকারী মোড় হতে যাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপ নয়া দিল্লির জন্য কৌশলগত উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, ২০২৭ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে পাকিস্তানের বিমান বহরে এই অত্যাধুনিক স্টিলথ প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হলে তা ভারতীয় বিমান বাহিনীর (আইএএফ) আকাশসীমায় আধিপত্য ও দূরপাল্লার কমব্যাট ডমিন্যান্সের প্রচলিত সমীকরণগুলোকে পুরোপুরি ওলোটপালোট করে দেবে।
যদিও ভারতের কাছে বর্তমানে ৫০০ থেকে ৬০০টি যুদ্ধবিমানের বিশাল বহর রয়েছে, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আধুনিক নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধকৌশলে কেবল বিমানের সংখ্যার চেয়ে রাডার এড়ানো (স্টিলথ) ক্ষমতা, সেন্সর ফিউশন এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কার্যকারিতাই যুদ্ধের প্রথম ধাপে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে।
পাকিস্তানের প্রস্তুতি ও চীনের কৌশল
ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিধু জে-৩৫ ক্লাস ফাইটার কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকেই পাকিস্তানি পাইলটরা চীনে এই বিমানের ওপর প্রশিক্ষণ শুরু করেছেন। গত ১ মে ২০২৬-এ চীন তাদের রপ্তানিযোগ্য সংস্করণ ‘J-35AE’ (যার গায়ে ‘AVIC 0001’ লেখা ছিল) প্রকাশ্যে আনে, যা মূলত পাকিস্তানের জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের রাফাল ও সুখোইয়ের জন্য কেন হুমকি?
ভারতের ফ্রন্টলাইন ফাইটার জেট ‘রাফাল’ এবং ‘সু-৩০এমকেআই’ অত্যন্ত শক্তিশালী ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হলেও এগুলোর কোনোটিই পঞ্চম প্রজন্মের রাডার-ফাঁকি দেওয়ার মতো (লো-অবজারভেবল) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি নয়। চীনের দাবি অনুযায়ী, জে-৩৫এ বিমানের রাডার সিগনেচার বা দৃশ্যমানতা মানুষের হাতের তালুর চেয়েও ছোট। এর ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী রাডার ব্যবস্থা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন রাশিয়ার এস-৪০০ বা ইসরায়েলি বারাক সিস্টেম) এই বিমানকে অনেক দেরিতে শনাক্ত করতে পারবে।
প্রখ্যাত ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, পাকিস্তানের হাতে মাত্র ২ থেকে ৩টি জে-৩৫এ স্কোয়াড্রন থাকলেই ভারতকে তাদের বিপুল সংখ্যক সু-৩০এমকেআই বিমানকে কেবল প্রতিরক্ষামূলক পাহারায় নিয়োজিত রাখতে বাধ্য করবে। বিশেষ করে যখন ভারতকে একই সাথে চীন ও পাকিস্তান— দুই সীমান্তেই (টু-ফ্রন্ট ওয়ার) চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী সমীকরণ
তবে বিশেষজ্ঞরা এও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ভারতের রয়েছে বিশাল শিল্প সক্ষমতা, শক্তিশালী লজিস্টিকস ব্যাকআপ এবং নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির ‘অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট’ (AMCA) প্রজেক্ট। এছাড়া পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটও এই বিশাল ৪-৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নে বড় বাধা হতে পারে।
তবে চুক্তিটি সম্পন্ন হলে দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল যুদ্ধবিমানের সংখ্যার লড়াই শেষ হয়ে প্রবেশ করবে ‘স্টিলথ ও তথ্য-প্রযুক্তির’ এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধে, যেখানে চীন বিশ্ব বাজারে আমেরিকার এফ-৩৫ এর বিকল্প হিসেবে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হবে।
