গোলাম পরওয়ারের অধ্যাপক ডিগ্রি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন অধ্যাপক নাহরিন

বাংলাদেশ রাজনীতি

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ‘অধ্যাপক’ ডিগ্রি ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নাহরিন ইসলাম খান। সেইসাথে তার বিরুদ্ধে জামায়াত নেতার দায়ের করা মামলা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। জাবি অধ্যাপক অভিযোগ করেছেন, নারী হওয়ায় জামায়াতের টার্গেটেড হামলার শিকার তিনি।

সম্প্রতি বেসরকারি একটি টেলিভিশনের টকশোতে এসব বিষয়ে কথা বলেন অধ্যাপক ড. নাহরিন।

তিনি জানান, যে তথ্য নিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, সেই তথ্যটি তিনি বলার আগে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় লাখখানেক বার শেয়ার হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যাদের বিরুদ্ধে এই কথাটি বলা হয়েছে, দুই সপ্তাহে কেন তাদের চোখে পড়েনি বা কেন আগে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, যারা এই তথ্যটি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রথম ছড়িয়েছিল, সেই পুরুষদের বিরুদ্ধে মামলা না হয়ে শুধু তার বিরুদ্ধে কেন হলো?

প্রসঙ্গত, জাবির অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খানের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ এনে গত মঙ্গলবার মামলা করেছেন সিরাজগঞ্জ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। সিরাজগঞ্জ সদর থানা আমলি আদালতে মামলাটি দায়ের করেন তিনি। আদালত অভিযোগটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত ২৫ অক্টোবর বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. নাহরিন ইসলাম বিবিসিকে বাংলাকে দেওয়া অধ্যাপক জাহিদুল ইসলামের একটি সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ টেনে ‘মিথ্যা, বানোয়াট ও কুরুচিপূর্ণ’ বক্তব্য দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সিরাজগঞ্জ জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতারা পালিয়ে গেলে তাদের স্ত্রীদের প্রতি জামায়াতের হক রয়েছে।’ পরবর্তী সময়ে বক্তব্যটির ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

মামলার প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক নাহরিন অভিযোগ করেন, তাকে টার্গেট করা হয়েছে কারণ তিনি একজন সোচ্চার নারী। জামায়াতে ইসলামী ‘জেন্ডার কার্ড’ ব্যবহার করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তারা নারীকে দিনে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা কাজ করার কথা বলে সম্পূর্ণভাবে তার অংশগ্রহণ থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তিনি নিজেকে এই ফ্রেমওয়ার্কের প্রথম শিকার বলে মনে করেন।

অধ্যাপক নাহরিন বলেন, যদি জামায়াতে ইসলামীর মানসম্মান নিয়ে এতই মাথাব্যথা থাকত, তাহলে তারা মাওলানা ভাসানীর নামে বা যারা টকশোতে তাদের ‘কাফের’ বা ‘মুনাফেক’ বলেন, তাদের বিরুদ্ধে কেন মামলা করেন না।

জাবি অধ্যাপক জামায়াত নেতাদের ‘অধ্যাপক’ উপাধি ব্যবহারের বৈধতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, যিনি তার নামে মামলাটি করেছেন, তিনি নিজেকে ‘অধ্যাপক’ হিসেবে পরিচয় দিলেও আসলে তিনি একটি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী এমন একটি দল, যেখানে যোগ দিলেই অনেকে ‘প্রফেসর’ হয়ে যান। তিনি উদাহরণ হিসেবে জামায়াতের পূর্বের প্রধান অধ্যাপক গোলাম আজম এবং বর্তমান নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারের কথা উল্লেখ করেন, যারা স্বল্প সময়ের জন্য একটি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন।

অধ্যাপক নাহরিন প্রশ্ন রাখেন যে, যারা একটি ছোট কলেজে দুই-তিন বছর শিক্ষকতা করেছেন, তাদের ‘অধ্যাপক’ বলা হয়; অথচ তার মতো একজন নারী যখন ২১ বছর চাকরি করে অধ্যাপক হন, তখন তার পদ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তিনি এটিকে ‘পদবীর অপব্যবহার’ বলে অভিহিত করেন।

এই শিক্ষাবিদ অভিযোগ করেন, জাকসুর নির্বাচনের পর থেকেই তিনি টার্গেটেড হয়েছেন। তার বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভিসির কাছে ইমেইল পাঠানো হয়েছে, যাতে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন বা রাজনৈতিক বক্তব্য না দেন।

মামলা দায়েরের আগে তাকে কোনো আইনি নোটিশ দেওয়া হয়নি বা বক্তব্য প্রত্যাহার করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি বলে দাবি করেন অধ্যাপক নাহরিন। তিনি বলেন, ক্ষমা চাওয়ার কথা মিডিয়ায় বলা হলেও তাকে কোনো লিগ্যাল নোটিশ পেতে হয়নি। তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং বিশ্বাস করেন যে আইন নিজস্ব পথে চলবে এবং মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিনা, তা আদালত দেখবে।

‘‘যেহেতু তারা মনে করেছে নারী মানেই দুর্বল এবং চুপ করে থাকবে, তাই শুধু তাকেই টার্গেট করা হয়েছে। তবে তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং বিশ্বাস করেন যে আইনই নির্ধারণ করবে মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিনা।’’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *