
গাজা উপত্যকায় চলমান সামরিক অভিযানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ব্যবস্থার ব্যাপক ও নজিরবিহীন ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধকে এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড়ে নিয়ে এসেছে। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে দ্রুত গতিতে লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা হচ্ছে, যার ফলস্বরূপ বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার কর্মীরা এই প্রযুক্তিকে ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপানো এক ধরনের ‘স্বয়ংক্রিয় বর্ণবৈষম্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের এআই সিস্টেমগুলি দ্রুত গতিতে লক্ষ্যবস্তু তৈরি প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করে তুলছে, যা মানবিক তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ডেটা-নির্ভর লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সরঞ্জামগুলি যুদ্ধক্ষেত্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে নতুনভাবে সাজিয়ে তুলছে, যা অ্যালগরিদমিক যুদ্ধের নৈতিক সীমা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করছে।
বিশাল ডেটাবেজ থেকে তৈরি করা ‘হত্যার তালিকা’, লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করার জন্য ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা, মেশিনগান লাগানো কোয়াডকপ্টার ড্রোন—ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত এই সিস্টেমগুলি গাজা যুদ্ধে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।
ডেটা প্রক্রিয়াকরণ এবং বোমা হামলার লক্ষ্যবস্তু তৈরির ক্ষেত্রে এআই প্রোগ্রামগুলির নির্মম দক্ষতা, সীমিত মানবিক তদারকির রিপোর্টের সঙ্গে মিলিত হয়ে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক হতাহতের জন্য আংশিকভাবে দায়ী।
এই যুদ্ধে অটোমেশন এবং মেশিন লার্নিংয়ের যে মাত্রায় ব্যবহার ও বিকাশ ঘটেছে, তা সামরিক বিশেষজ্ঞদের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করেছে যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ কীভাবে হবে, সেই ক্ষেত্রে বিশ্ব এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
ফিলিস্তিনিদের জন্য এই এআই-চালিত সংঘাতের উত্তরাধিকার কেবল তাৎক্ষণিক মৃত্যু ও ধ্বংসের চিহ্ন ছাড়িয়ে যায়। এই প্রযুক্তিগুলি সম্ভবত দখলদারিত্বের কাজে পুনরায় ব্যবহার করা হবে, যা বহু মানুষের মতে একটি “স্বয়ংক্রিয় বর্ণবৈষম্য”কে আরও দৃঢ় করবে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলিকে একটি গবেষণাগার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
তারা গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে বছরের পর বছর ধরে বিপুল পরিমাণে গোয়েন্দা তথ্য ও ডেটা সংগ্রহ করেছে। তা সত্ত্বেও, ২০১৪ এবং ২০২১ সালে গাজায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সাথে পূর্ববর্তী যুদ্ধগুলির সময়, ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর কাছে লক্ষ্যবস্তুর অভাব দেখা গিয়েছিল।
এআই-এর মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু তৈরি: ‘গণহত্যার কারখানা’
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এআই-চালিত সিস্টেমগুলি বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে যুদ্ধকালীন লক্ষ্যবস্তু তৈরি এবং “হত্যা তালিকা” প্রস্তুত করার ক্ষমতা রাখে। এই দ্রুত গতির স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, যেখানে মানবিক তদারকি খুবই সীমিত, তাকেই উচ্চ বেসামরিক হতাহতের কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি ম্যাগাজিন +৯৭২-এর তদন্তে এই অভিযানের নেপথ্যে থাকা এআই-সিস্টেমগুলির বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।
“দ্য গসপেল”: এটি একটি এআই সিস্টেম, যা অতীতের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে ভবনগুলিকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্বাচন করে। এক প্রাক্তন ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা এই সিস্টেমকে “গণহত্যার কারখানা” বলে বর্ণনা করেছেন।
“ল্যাভেন্ডার”: পাঁচ মাস পরে প্রকাশিত আরেকটি তদন্তে জানা যায়, এই প্রোগ্রামটি ভবনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট মানুষকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করত। রিপোর্ট অনুযায়ী, সংঘাতের প্রথম দিকে সিস্টেমটি হামাস ও ইসলামিক জিহাদের প্রায় ৩৭,০০০ সন্দেহভাজন সদস্যকে তাদের বাড়িসহ সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল।
তদন্তে আরও একটি উদ্বেগজনক সিস্টেমের কথা জানা যায়, তা হলো “হোয়্যারস ড্যাডি?”। এই প্রোগ্রামটি ল্যাভেন্ডার দ্বারা চিহ্নিত হাজার হাজার ব্যক্তিকে অনুসরণ করত এবং যখন তারা তাদের পারিবারিক বাড়িতে পৌঁছাত, তখন হামলার জন্য সংকেত দিত।সূত্রগুলো জানিয়েছে, সামরিক বাহিনী সাধারণত রাতে, পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই তাদের বাড়িতে বোমা হামলা করতে পছন্দ করত, কারণ সেখানে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পাওয়া সহজ হতো।
ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের গ্রহণযোগ্যতা কিভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে তা রিপোর্টে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে ইজরায়েলি সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, নিম্ন-স্তরের একজন হামাস সদস্যের জন্য ১৫ থেকে ২০ জন বেসামরিক নাগরিক এবং একজন সিনিয়র কমান্ডারের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে ১০০ জন পর্যন্ত বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা ‘গ্রহণযোগ্য’।
এআই প্রোগ্রামের মাধ্যমে চিহ্নিত লক্ষ্যবস্তুগুলির মানবিক তদারকির মাত্রা ছিল নামমাত্র। সূত্রগুলো বর্ণনা করেছে, বোমা হামলার অনুমোদন দেওয়ার আগে প্রতিটি লক্ষ্যবস্তু যাচাই করতে মাত্র ২০ সেকেন্ড ব্যয় করা হতো, যা প্রক্রিয়াটিকে একটি “রাবার স্ট্যাম্প”-এ পরিণত করে।
ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি মাউরা স্কুল অফ ল-এর সহযোগী অধ্যাপক এবং প্রাক্তন ইসরায়েলি গোয়েন্দা বিশ্লেষক আসাফ লুবিন বলেছেন, এই প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং যুদ্ধের আইনের মূল ভিত্তি—যেখানে লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানবীয় তদারকির মাধ্যমে পর্যালোচনা, যাচাই এবং প্রশ্ন করার সুযোগ থাকবে—তা শিথিল করে দিয়েছে।
“স্বয়ংক্রিয় বর্ণবৈষম্যের” দিকে যাত্রা
বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এই বিপুল বেসামরিক মৃত্যুর চূড়ান্ত দায় ইসরায়েলের এবং তাদের সামরিক বাহিনীর আচরণের উপর বর্তায়। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, গাজা যুদ্ধে এই এআই সিস্টেমগুলির বিকাশ কেবল ধ্বংসের কারণই নয়, এটি ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যতের ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
ফিলিস্তিনিদের ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা ‘৭আমলেহ’-এর নীতি ব্যবস্থাপক জালাল আবুখাটের মন্তব্য করেছেন, “স্বয়ংক্রিয় বর্ণবৈষম্য কেবল বাস্তব হচ্ছে না, এটি আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।” তিনি মনে করেন, “যুদ্ধ চলাকালীন উন্নত করা এই এআই সিস্টেমগুলি দখলদারিত্ব এবং বর্ণবৈষম্যমূলক শাসনকে আরও শক্তিশালী ও প্রসারিত করবে।”
বিশেষজ্ঞরা গাজার এই যুদ্ধকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যৎ যুদ্ধকালীন কার্যকলাপকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে। এই প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং দ্রুত বিকাশের ফলে বিশ্ব এক অত্যন্ত বিপজ্জনক সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
