খবর ৫২

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু নেতার মধ্যে ‘এবার আমাদের পালা’ এই মানসিকতার বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর থেকে দেশজুড়ে দলবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট, এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংস্কৃতি নতুন বাংলাদেশের জন্য এক অশনিসংকেত বলে মনে করে টিআইবি।
রোববার (২৪ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি জানিয়েছে, মুখে সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে আধিপত্য, দখলদারি ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি অব্যাহত আছে। এর ফলে একটি গণতান্ত্রিক ‘নতুন বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার গণআকাঙ্ক্ষা পদদলিত হচ্ছে।
ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিচ্ছবি
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর গত এক বছরে যে রাজনৈতিক দলগুলো সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়েছে, তাদের একাংশের কর্মকাণ্ড পতনের আগের সরকারি দলের ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বার্থসিদ্ধির অসুস্থ চর্চার প্রতিচ্ছবি। তিনি আরও বলেন, “ক্ষমতাপ্রত্যাশী ও প্রভাবশালী দলগুলোর নেতা-কর্মীদের একাংশের সরাসরি এবং পারস্পরিক যোগসাজশে দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক কার্যক্রম আবারও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।” দুঃখজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে এই যোগসাজশে আগের রাজনৈতিক শক্তিও নির্বিকারভাবে জড়িত থাকছে।
টিআইবির মতে, দাবি আদায়ে বলপ্রয়োগের পাশাপাশি কিছু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এবং অতিরিক্ত ক্ষমতাধর শক্তির যোগসাজশে ‘গণতন্ত্রের’ আড়ালে সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণ করা হচ্ছে। নারী অধিকার এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ওপরও আঘাত আসছে।
নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অস্থিরতা
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশের মধ্যে দায়িত্বহীনতা এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার অভাব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। যদিও দলের উচ্চপর্যায় থেকে কিছু সতর্কতা ও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসন কার্যকরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বরং সহায়ক ও সুরক্ষাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
টিআইবি জানিয়েছে, স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পরপরই জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মী দখলদারি, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে লিপ্ত হয়েছেন। ‘এবার আমাদের পালা’ এই মানসিকতার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। পরিবহন টার্মিনাল, খনিজ সম্পদ, সেতু, বাজার ও জলমহাল দখলের মতো পুরোনো দুর্বৃত্তায়নের ধারা আবারও ফিরে আসছে।
আত্মঘাতী পথ এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
টিআইবি আরও বলেছে যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া নতুন রাজনৈতিক দলগুলোও সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তাদের নেতা-কর্মীদের একাংশ চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তারা পুরোনো স্বার্থান্বেষী ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক চর্চাকেই অনুসরণ করে একটি আত্মঘাতী পথ বেছে নিয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা, নৈতিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্তদের স্বপ্ন ভঙ্গ হবে। একটি নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য এখনই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা। তা না হলে নতুন বাংলাদেশ আর পতিত স্বৈরাচারের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
