
সরকার প্রধান বা সংসদ নেতা এবং দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হতে পারবে না বলে প্রস্তাব করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে কমিশনের এই প্রস্তাবে ভিন্নমত পোষণ করেছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা এটা ওপেন রাখতে বলেছি। অপসনটা পলিটিক্যাল পার্টির এবং মেজরিটি পার্টি অব দ্যা পার্লামেন্টের অপশনটা রাখা উচিত। কারণ সেই মেজরিটি পার্টির সংসদে সংসদীয় দলের নেতা সেটা অন্য বিষয়, পার্লামেন্টের ভেতরের বিষয় না। আর পার্টির যে প্রধান তিনি প্রধান মন্ত্রী হতে পারবেন না এই প্রাকটিসটা তো আমরা দেখি না। আমরা যদি ওয়েস্ট মিনিস্টার টাইপ অফ গভমেন্টে দেখি, বৃটেনের বর্তমান প্রাকটিস দেখি যে, পার্টি চিফ প্রধানমন্ত্রী হন, এক্ষেত্রে এটা একটা ডেমোক্রেটিক প্রাকটিস তাতে কোনো অসুবিধা নেই। সেটা পার্টির স্বাধীনতা, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা, ডেমোক্রেটিক প্রাকটিসের স্বাধীনতা। সুষ্ঠু ভোটে যে সংসদ নির্বাচিত হবে সেখানে আমাদের মনে রাখতে হবে জনগণ কাকে চায়। জনগণ হচ্ছে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং সেটা পার্লামেন্ট মেম্বার ও মেজরিটি পার্টির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করা উচিত।
গতকাল রোববার জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে বৈঠকের বিষয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিহউল্লাহ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং সাবেক সচিব আবু মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।
বৈঠকের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখানে প্রশ্ন এসেছে যে, লিডার অফ দ্য হাউজ কি একই ব্যক্তি হবে। আমরা বলেছি যে, পার্টি চিফকেই যে প্রধানমন্ত্রী করবে সেটা আরেকজনকেও তো করতে পারে, অপশন থাকা উচিত। মেজরিটি পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রী হলেও যে সংসদ নেতা হবে, কি হবে না, অন্যজন হতে পারে, সেটাতেও অপশন রাখা উচিত। আমরা এসব অপশন খোলা রাখতে বলেছি ডেমোক্রেটিক প্রাকটিসের জন্য।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে আমরা শুনেছি আস্থা বিল এবং অর্থ বিলের ক্ষেত্রে প্রায় সবাই একমত। রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধার্থে এবং সরকারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার স্বার্থে আমরা চারটা বিষয় এখানে উল্লেখ করেছি। অর্থ বিল, সংবিধান সংশোধনী বিল, আস্থা ভোট এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন, এই চারটা বিষয় বাদে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে তাদের বক্তব্য এবং ভোট প্রদান করতে পারবে। তাতে তাদের সংসদ সদস্যপদ বিলুপ্ত হবে না।
নারী আসন সংখ্যা একশ’তে উন্নীতিকরণ: বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, আমরা বলেছি, নারীদের আসন সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ তে উন্নীত করার ব্যাপারে আমরা একমত। কিন্তু সেটা বিদ্যমান পদ্ধতিতেই মনোনয়ন হবে, সেটা আমাদের প্রস্তাবে বলেছি। তবে এটা (নারী আসন সংখ্যা উন্নীত) আমরা বলেছি, নেক্সট পার্লামেন্ট গঠন করার পরে, যখন তিনশ’ প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত হবে এবং সংসদে এই সংক্রান্ত সংশোধনী গৃহীত হলে বর্তমানের ৫০ এবং আরো ৫০ নিয়ে যে ১০০ গঠিত হবে, সেই ৪০০ সদস্য বিশিষ্ট সদস্য বিশিষ্ট সংসদে বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করে কোন পদ্ধতিতে তার পরবর্তি সংসদে নারী আসনের নির্বাচনটা হবে তখন সংসদে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। বর্তমানের জন্য বিদ্যমান পদ্ধতি যথার্ত।
ভোটের ন্যূনতম বয়স ২১ এর ক্ষেত্রে বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে। তিনি বলেন, সকল স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান পদে বিরোধী দলের নেয়ার প্রস্তাব এসেছে। আমরা বলেছি, এটা বাস্তবায়ন নয়। এটা সংসদের প্রাকটিস ও সংসদের ওপরে ছেড়ে দেয়া উচিত। তবে আমরা এভাবে একমত হয়েছি যে, কিছু কিছু স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান পদে যেমন পাবলিক আন্ডারটেইকেন কমিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি এই জাতীয় কিছু কিছু কমিটি আমরা বিরোধী দলীয় মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচন করা যায়, এই বিষয়ে একমত হয়েছি।
সালাহউদ্দিন জানান, উচ্চ কক্ষে আসন সংখ্যা ১০০তে রাখার বিষয়ে কমিশনের প্রস্তাবের সাথে একমত হয়েছে বিএনপি। উচ্চ কক্ষের নির্বাচন পদ্ধতি, কারা আসবে, আনুপাতিক হারে আসবে কিনা সে বিষয়ে বিএনপি বলেছে যে, আগে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদের সংশোধনীটা সংসদে গৃহীত হোক, দ্বি-কক্ষ গঠন হলে পরে সংসদে আলাপ করে নির্বাচন পদ্ধতি ঠিক করা ভালো হবে।
আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ প্রাথমিকভাবে সংসদ উপস্থাপনের কথা উনারা বলেছেন। আমরা বলেছি, এটা সুবিবেচনা প্রসূত নয়। তাহলে কোনো চুক্তি রাষ্ট্র যেমন বাণিজ্যিক চুক্তি আছে, বাইলেটারাল চুক্তি, বিনিয়োগ চুক্তি আছে যেগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নরমাল প্রাকটিস করা হয়। চুক্তির পরে সংসদে উপস্থাপনের যে বিধান যেটা আমরা যেন প্রয়োগ করি। এক্ষেত্রে আমরা বলেছি যে, ডিফেন্স যেসব চুক্তি হয়ে থাকে যেগুলোকে আমরা বলি যে, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি সেগুলো ক্লোজড সেশনে করাটাই উত্তম। ন্যায়পাল নিয়োগের ক্ষেত্রে বিএনপি বিদ্যমান আইনের যথাযোগ্য যুগপোযোগী করার জন্য নীতিগতভাবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে একমত হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেতা বলেন, আমরা বলেছি যে, প্রেসিডেন্টকে কি কি বিষয়ে ক্ষমতায়িত করে আইন প্রণয়ন করা যায় সেসব কিছু বিষয়ে এবং নিয়োগের কিছু বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। সেগুলো নতুন আইন প্রণয়ন করে সংসদ প্রণীত করা যাবে। সেক্ষেত্রে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স এবং প্রেসিডেন্টকে মোর এ্যামপাওয়ার করা সেটা নিশ্চিত করা হবে।
ন্যাশনাল কন্টিস্টিটিউশন কাউন্সিল(এনসিসি) প্রস্তাবে একমত নই বিএনপি। সালাহউদ্দিন বলেন, এটা একটা নতুন ধারণা বাংলাদেশের পলিটিক্যাল বা সংসদীয় কালচারে। যেখানে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, উভয় কক্ষের স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতিসহ আরও কয়েকজনের কথা বলা আছে। এই বডিটার হাতে রাষ্ট্রের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ যেমন সব কমিশন, তিন বাহিনী প্রধান থেকে শুরু করে পিএসসি, দুদকসহ আরও যেসব সাংবিধানিক পদ আছে এগুলো আমরা একমত নই। কারণ, রাষ্ট্রের মধ্যে এক্সিকিউটিভ ফাংশনটাকে এতো বেশি লিমিট করা হবে যে এক্সিকিউটিভ ও প্রধানমন্ত্রী যে নামেই ডাকি তাদের আর রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এখতিয়ার বা রাষ্ট্র পরিচালনা দায় হয়ে যাবে। অথচ রেন্সপোনসেবিলিটি থাকবে ইলেক্টেড প্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাছে এবং সংসদে কাছে। সেই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর অথচ তার কাছে তেমন কোনো পাওয়ার দেয়া থাকলো না। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর রাখার পক্ষে মত দিয়েছে বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী যিনি হবেন তিনি পরপর দুই বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না এই প্রস্তাব বিএনপির জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা বলেছি, পরপর দুইবারের বেশি কেউ একজন প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে যদি দুই বারের পর একবার গ্যাপ হয় তার পরবর্তিকালে জনগণ যদি সেই দলকে নির্বাচিত করে সেই পার্টি মেজরিটি পেয়ে যদি ডিসাইড করে তাহলে সেই একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হতেও পারেন। কিন্তু কেনো আপনারা ধরে নিচ্ছেন যে, সেইম লিডার বার বার হবেন। আমরা অপশনটা রাখতে চাই যে, বাধ্যবাধকতা করা যাবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ৯০ দিনের জন্য ট্যাম্পোরারেলি আন ইলেক্টেড গভমেন্ট চান কেনো? দিস ইজ ডটট্রেইন অব ন্যাসেসিটি। আমাদের পলিটিক্যাল হিস্ট্রিতে ও কালচারে দেখা গেছে উইথআউট কেয়ারটেকার গভর্মেন্ট আমরা কোনো ইলেকশনই অবাধ, নিরপেক্ষ সুষ্ঠু করতে পারি না। যতদিন পর্যন্ত আমরা সেই কালচারে উপণীত না হতে পারব ততদিন পর্যন্ত আমাদের নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কেয়ারটেকারের বিধানটা রাখা উচিত। এই ভোটের জন্য আমরা ১৫ বছর আন্দোলনও করেছি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিশনের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বদিউল আলম মজুমদার, ইফতেখারুজ্জামান, সফর রাজ হোসেন এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারি মনির হায়দার। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিএনপি ঐকমত্য কমিশনের সাথে বৈঠকে বসেছিলো।
