
‘ইসরাইলকে সমর্থনের অর্থ আরো বেশি মৃত্যু, আরো বেশি ধ্বংস, আরো বেশি বর্ণবাদ এবং আরো বেশি নিরীহ জীবনের ক্ষয়। এটি শান্তি ও ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ। এখন মানুষকে একটিকে বেছে নিতে হবে’।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের একজন স্বাক্ষরকারীর নাতি ইসরায়েলি অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক মিকো পেলেড ফিলিস্তিনের প্রতি তেল আবিবের নীতির সমালোচনা করে দৃঢ়ভাবে বলেছেন, তারা ফিলিস্তিনিদের পরাজিত করতে পারবে না।
লেখক, যার বাবা ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে একজন জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তিনি আনাদোলুর সাথে কথা বলেন তার অ্যাক্টিভিস্ট জীবনের যাত্রা সম্পর্কে, যেখানে তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষাবলম্বন করেন এবং ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া বর্তমান সংঘাতের মূল্যায়ন করেন।
‘আমি একটি খুব বিশিষ্ট দেশপ্রেমী পরিবার থেকে এসেছি। আমি দেশপ্রেমী হিসেবে বেড়ে উঠেছি, আমার দেশ, আমার রাষ্ট্র এবং অবশ্যই জায়নবাদের একজন দৃঢ় সমর্থক’, বলেন পেলেড। তিনি তার জীবনের প্রথম দিকে তার বাবার চিন্তাধারা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন এবং কিছুকাল সামরিক বাহিনীতে সেবা দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে অনুতাপে ছেড়ে দেন।
‘আমার বাবা, যুদ্ধের ঠিক পরে ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় বলেছিলেন :
‘দেখো, আমরা এখানে চিরকালের জন্য আছি, আমাদের অস্তিত্ব আর অনিশ্চিত বা বিপন্ন নয়। আমাদের ফিলিস্তিনিদেরকে ফিলিস্তিনের একটি ছোট অংশে তাদের ছোট রাষ্ট্র গঠনের অনুমতি দিতে হবে।’ যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তারা পূর্ব জেরুসালেম এবং পশ্চিম তীরে বিশাল শহরগুলো তৈরি করতে শুরু করে।
‘জায়নবাদে ফিলিস্তিনের কোনো স্থান নেই’
জায়নবাদের মৌলিক দর্শনে ফিলিস্তিন নামে কোনো জায়গার অস্তিত্ব নেই বলে জোর দিয়ে পেলেড বলেন : ‘জায়নবাদ অনুসারে, এটি ইসরায়েলি ভূমি এবং এসব জমি সেখানে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের নয়, বরং বিশ্বের সকল ইহুদিদের। ‘যদি আপনার কাছে একটি শ্রেষ্ঠত্ববাদী মতাদর্শ থাকে, অর্থাৎ আপনি যদি যুক্তি দেন যে, একটি গোষ্ঠী অন্যদের চেয়ে বেশি অধিকার রাখে, তাহলে আপনাকে সহিংসতা ব্যবহার করতেই হবে। এ বর্ণবাদী মতাদর্শ বাস্তবায়নের জন্য আপনাকে একটি বর্ণবৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থা রাখতে হবে। এটাই হলো ইসরায়েল রাষ্ট্র’, তিনি বলেন।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা গত মাসে শুরু হয়নি, বরং ৭৫ বছর আগে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সাথে শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করে পেলেড বলেন : ‘একটি আন্দোলন হিসেবে জায়নবাদীরা এবং পরবর্তীতে এ আন্দোলন থেকে জন্ম নেয়া রাষ্ট্র ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এ যুদ্ধে আমরা দেখেছি জাতিগত নির্মূলকরণ, গণহত্যার নীতি এবং একটি বর্ণবাদী বর্ণবৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থা’।
‘ইসরায়েল একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’
ইসরায়েলকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে বর্ণনা করে পেলেড বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা যে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন তার দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনিরা প্রতিদিনই সন্ত্রাসের সম্মুখীন হচ্ছেন। রাস্তায় হাঁটার সময় তোমাকে মারা হবে কি না, তোমার বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার সময় নিরাপদ থাকবে কি না, তোমার বাড়ি ভেঙে দেওয়া হবে কি না, তোমার ভাইদের ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা ধরে নেওয়া বা অপহৃত করে অদৃশ্য হয়ে যাবে কি না তুমি কিছুই জানো না’।
ইসরায়েলি-মার্কিনি এই ব্যক্তি বলেন, দু’দশকেরও বেশি আগে এক পরিবারের সদস্যের মৃত্যু তাকে ইসরায়েলের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে প্ররোচিত করে। তিনি বলেন, ‘১৯৯৭ সালে আমার বোনের ছোট মেয়েটি জেরুজালেমে এক আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয়। তার বয়স ছিল ১৩ বছর। এটি এমন এক ট্র্যাজেডি, যা একজন মানুষকে ভেতর থেকে নাড়া দিয়ে দেয়, এমন ঘটনার পর আপনি আর একই চোখে দুনিয়ার দিকে তাকাতে পারেন না। এটি আমাকে আমার শেখা বিষয়গুলো, ইসরায়েলের অস্তিত্বকে খতিয়ে দেখার দিকে নিয়ে যায়’। এরপর তিনি উত্তর খুঁজতে ফিলিস্তিন সফরে বের হন।
পেলেড বলেন, ‘যখন আমি এ যাত্রা শুরু করলাম, বুঝতে পারলাম, যে দেশটাকে আমি আমার মনে করতাম, সেটি আসলে অন্য কারো দেশ। আমি এক ধরনের উপনিবেশে বাস করছিলাম, এক ওপরে-ওপরে, কৃত্রিম বাস্তবতায়, যা সত্যিকারের ছিল না। এর কোনো ভিত্তি ছিল না বাস্তবতার ওপর। এটি ছিল এক মিথ্যার ওপর নির্মিত বর্ণবৈষম্যমূলক রাষ্ট্র, আর এসব মিথ্যাই ইসরায়েলি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে বৈধতা দিয়েছে’।
গাজায় ইসরায়েলের চলমান হামলা, যা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের সীমান্তপারের আক্রমণ থেকে শুরু হয়েছে, সেই প্রসঙ্গে পেলেড বলেন : ‘যেসব ফিলিস্তিনির এ ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, তারাই আজ ভয়াবহ মূল্য দিচ্ছেন। ইসরায়েল অপমানিত হয়েছে, আর এখন তারা তাদের সমস্ত প্রতিশোধ আর ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলছে নিরপরাধ মানুষদের ওপর, সাধারণ নাগরিকদেরওপর, যাদের এ হামলার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই’। ইসরায়েলের অবরুদ্ধ ওই ভূমিতে পরিচালিত স্থল ও বিমান হামলায় এখন পর্যন্ত ১৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।
পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রতিটি মন্তব্যেই হামাসকে নিন্দা করার যে প্রবণতা দেখা যায়, তা উল্লেখ করে পেলেড বলেন : ‘যারা প্রতিরোধের জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে, এত দীর্ঘ সময় ধরে যাদের ওপর চাপ চলছে, তাদের নিন্দা করা হাস্যকর। এটা প্রত্যাশিতই ছিল। যদি আমরা প্রতিরোধ দূর করতে চাই, তাহলে আমাদের আগে দমন ও চাপ দূর করতে হবে। প্রতিরোধ সবসময়ই দমনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া। গত ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা আরো বড় ধরনের সহিংসতার জবাবে ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়া বেশিরভাগ সময়ই অহিংস ছিল’।
‘যদি নিন্দা করার কিছু থাকে, তবে তা হলো ওই বর্ণবৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থাকে নিন্দা করা। নিন্দা করা দরকার সেই সহিংসতা ও নৃশংসতাকে, যার মুখোমুখি ফিলিস্তিনিরা প্রতিদিন হয়; হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে, যাদের আমরা কথা বলছি ঠিক সেই সময়ে পশ্চিম তীর থেকে গ্রেফতার করা হচ্ছে ও হত্যা করা হচ্ছে; ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে চর্চিত বর্ণবাদকে। নিন্দা করা দরকার সেই ইসরায়েলি চিকিৎসকদের, যারা গাজায় হাসপাতাল বোমাবর্ষণের অনুমোদন দিয়ে আবেদনে সই করেছেন; সেই ছাত্রদের, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি নাগরিকদের বহিষ্কারের দাবি তুলছে; এবং আরো অনেক কিছুকে।কিন্তু দমনের শিকার একটি জাতিকে প্রতিরোধের জন্য নিন্দা করা চরম ভণ্ডামি এবং অর্থহীন’।
‘ফিলিস্তিনকে পরাজিত করা যাবে না’
বর্তমান সংঘাত কিভাবে গড়াবে তা অনিশ্চিত, তবে তিনি দৃঢ়ভাবে জানান : ‘সন্দেহ নেই, একটি বিষয় পরিষ্কার তারা ফিলিস্তিনিদের পরাজিত করতে পারবে না। আপনি সেটাকে হামাস বলুন বা অন্য কিছু। আপনি যাই বলুন না কেন, এটা কোনো ব্যাপার না। ফিলিস্তিনিরা, তারা যে আন্দোলনেরই অন্তর্ভুক্ত হোক না কেন, পরাজিত হবে না’। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যেকোনো সমর্থন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে পেলেড বলেন : ‘ইসরায়েল এমন সব কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে, যা আমরা খারাপ বলে জানি। ইসরায়েলকে সমর্থন করার অর্থ হলো আরো বেশি মৃত্যু, আরো বেশি ধ্বংস, আরো বেশি বর্ণবাদ এবং আরো বেশি নিরীহ জীবনের ক্ষয়। এটি শান্তি ও ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ। এখন মানুষকে একটিকে বেছে নিতে হবে।
ফিলিস্তিনিদেরকে বিপুল মূল্য দিতে হলেও তারা সর্বশক্তি দিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে বলে জোর দিয়ে পেলেড বলেন, তিনি আশা করেন এ সমস্যার সমাধান এগিয়ে যাবে। ৭ অক্টোবর যে বিশাল পরিবর্তনটি হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি, তা ফিলিস্তিনি ইস্যুটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রধানত আন্তর্জাতিকভাবে আরো বেশি সমর্থন লাভ করে ফিলিস্তিনিদেরকে তারা যা সত্যিই প্রাপ্য, তা দাবি করার সুযোগ দেবে। আমি মনে করি ফিলিস্তিনিরা সবসময় খুব কম চেয়েছে এবং খুব কম পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, কিন্তু আমার মনে হয় এখন পুরো ফিলিস্তিন দাবি করার সময় এসেছে’। সূত্র : টিআরটি ওয়ার্ল্ড
