ঢাবি ছাত্রদল নেতা সাম্য হত্যাকান্ড- উত্তাল ক্যাম্পাস, তদন্তে নতুন মোড়

জাতীয় শিরোনাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্যর নির্মম হত্যাকান্ড ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ঘটনার দুইদিন পরও উঠে আসছে নতুন নতুন তথ্য। একদিকে চলছে প্রতিবাদ, অন্যদিকে তদন্তে উঠে আসছে নানা ধোঁয়াশা ও জটিলতা। হত্যার বিচার, ঢাবি ভিসি, প্রক্টর ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল। হত্যার রহস্য উন্মোচনে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সকল ভাসমান অস্থায়ী দোকানপাট উচ্ছেদ করেছে সিটি করপোরেশন। স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হচ্ছে রাজু ভাস্কর্যের পেছনের উদ্যান গেইট।

গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল সাম্য হত্যার দ্বিতীয় দিন। এদিন সাম্যের স্মৃতিতে পূর্ণদিবস শোক দিবস পালন করে বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী অর্ধ দিবস ক্লাস পরীক্ষা বন্ধের পরিবর্তে গতকাল দুপুরে পূর্ণ দিবস বন্ধের ঘোষণা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনের সামনে এক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে ছাত্রদল। এসময় ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাড়াও ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণসহ রাজধানীর বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলো।

বিক্ষোভ সমাবেশে সাম্য হত্যার বিচার, ঢাবি ভিসি, প্রক্টর ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি জানায় সংগঠনটি। সংগঠনের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে খুন হতে হবে এটা কোনোভাবেই আমরা প্রত্যাশা করিনি। পুরো জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটিও লাশ পড়েনি। কিন্তু আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বুকে একটা শিক্ষার্থী খুন হলো অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ নেই! আমরা আমাদের ভাইয়ের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ ভিসি, প্রক্টরের পদত্যাগ চাই। আমরা সাম্য হত্যার বিচার চাই। একইসাথে এই ব্যর্থতার দায়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বিচার চাই। এসময় ঢাবি ভিসি প্রক্টরকে উদ্দেশ্য করে রাকিব বলেন, আপনারা সম্মানিত মানুষ, আমরা আপনাদের জোর করছি না, বরং আমরা চাই আপনারা শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে সসম্মানে পদত্যাগ করুন।

সাম্য হত্যার বিচারের দাবিতে গতকাল ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলোর কয়েকজন নেতাকর্মী মিলে “সন্ত্রাস বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ” নামের একটি প্লাটফর্ম তৈরি করে। এই ব্যানারে তারা সাম্য হত্যার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ১দিনের শোক ও অর্ধদিবস ক্লাস, পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনে জোরপূর্বক তালা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া সাম্য হত্যার বিচার দাবিতে গতকাল সন্ধ্যায় শাহবাগ থানা অবরোধ করে সংগঠনটি।

বৃহস্পতিবার দুপুরে এসব সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনগুলোতে তালা দেয়। এর আগে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্রæত ভবন ত্যাগ করতে নির্দেশ দেয় এসব নেতাকর্মী। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে গিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ভয়ে অনেক শিক্ষার্থী গ্রন্থাগার থেকে বের হয়ে যায়। শিক্ষক কর্মকর্তাদের রুমে রুমে গিয়ে বের হয়ে যেতে নির্দেশ দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, এদিন দুপুরে ভবনে ঢুকে প্লাটফর্মটির নেতাকর্মীরা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্রæত বের হয়ে যেতে নির্দেশ দেন। ভয়ে সবাই দ্রæত বের হয়ে যান এবং পরে তারা ভবনের ফটকে তালা দেয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রশাসনিক ভবনের প্রতিটি কক্ষে তালা ঝুলছে। কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানান, শিক্ষার্থীরা স্ট্রাইক করেছে। তারা এসে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোন কার্যক্রম চলবে না, সবাই বের হয়ে যান। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণও করেছেন।

ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সরকার, আন্তর্জাতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান, ক্রীড়া সম্পাদক সাইফ উল্লাহ সাইফ, কবি জসীম উদ্দিন হলের প্রচার সম্পাদক তানভীর বারী হামিম, সূর্য সেন হলের প্রচার সম্পাদক প্রান্ত মাহমুদ, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল এবং বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সংগঠক সীমা আক্তার প্রমুখ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুন্সী শামস উদ্দিন আহম্মদ ইনকিলাবকে বলেন, তারা প্রায়ই আসতো, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিষয়ে অবজারভেশন জানাতো। কিন্তু আজ তারা এসে বললো দুই মিনিটর মধ্যে বেরিয়ে যেতে হবে। এমন আচরণ আমরা বিগত সময়ে কোনো ছাত্র সংগঠন থেকে পাইনি। আমরা তাৎক্ষণিক প্রক্টরের সাথে আলাপ করে পরিস্থিতি অনুযায়ী সবাই বেরিয়ে যেতে বাধ্য হই।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক সাইফ উল্লাহ সাইফ বলেন, আমরা কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ করিনি। সবাইকে শালীনভাবে কক্ষ ছাড়তে বলেছি। প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা সত্তে¡ও তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল, এমনকি কেউ কালো ব্যাজও ধারণ করেননি।

তালা মারার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিএম কাওসার বলেন, সাম্য রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় মৃত্যুর দুদিন পরে শোক দিবস পালন করছে। মৃত্যুর একদিন পর ক্লাস-পরীক্ষা চলে। এমনকি ক্রিকেট খেলাও হয়েছে। প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় অ্যাকাডেমিক ভবনসহ প্রশাসনিকভবনগুলোতে তালা দিয়েছি। আমরা তো চাই না শিক্ষক শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হোক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যে ভ‚মিকা রাখা দরকার ছিল তারা তো সেটা করেনি।

ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ভবনে তালা দেওয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, আবেগের বহিঃপ্রকাশটা এভাবে না হলেও পারতো। আমরা তো আমাদের শিক্ষার্থীর প্রতি সম্মান রেখে পূর্ণদিবস শোক দিবস ঘোষণা করেছি, ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ রেখেছি। তারপরও তারা যেটা করেছে সেটা সিম্বোলিক প্রতিবাদ বলেই আমরা ধরে নিচ্ছি।

এদিকে সাম্য হত্যার ঘটনায় নতুন কিছু তথ্য সামনে এসেছে। গভীর রাতে সাম্যর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গমন, ও সেখানে সংঘটিত ঘটনা নিয়েও ধোঁয়াশা সৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল দুইজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাথে কথা হয় ইনকিলাবের। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কালীমন্দিরের ম্যানেজিং কমিটির এক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হত্যার ঘটনাটা ঘটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে কালীমন্দিরের উত্তর পশ্চিমের পানির ফোয়ারার পাশে। রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। আমি ও আমার একজন সহযোগী মন্দিরের কাজ শেষে বের হচ্ছিলাম। হঠাৎ হাউকাউ দেখে সেদিকে গিয়ে দেখি সাম্য রক্তাক্ত হয়ে একজনকে ধরতে চেষ্টা করছে আর তার সাথে থাকা দুই বন্ধু অন্য দুইজনকে মারধর করছে। তাদের উভয় পক্ষেই মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। তবে কারা আগে আক্রমণ করেছে তা জানি না। আমরা গিয়ে দেখেছি দুই পক্ষই আহত হয়েছে। সাম্যর অবস্থা গুরুতর হওয়াই আমরা বলেছি তাকে দ্রæত হাসাপাতালে নিয়ে যেতে। তারপর তার দুই বন্ধু (বায়েজিদ ও রাফি) তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। অন্যদিকে আসামিরাও যেহেতু রক্তাক্ত ছিল তাই উপস্থিত সবাই তাদেরকেও হাসপাতালে যেতে বলে এবং ইতোমধ্যেই আমরা পুলিশ কল করি। পুলিশ আসলে আমরা তাদেরকে পুলিশের হাতে তুলে দিই।

সুলতান মাহমুদ সুজন সরকার নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আমি ও আমার মামা রাত পৌনে ১২টার দিকে মুক্ত মঞ্চের পাশের রাস্তা দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বের হচ্ছিলাম। এমন সময় দেখি পাশে একটা ছেলেকে (সাম্য) কেউ খুব মারধর করছে। ছেলেটা রক্তাক্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লেও তাকে মারধর করতে থাকে। তখন আমি গিয়ে বাঁচাতে চেষ্টা করি। তারপর সাম্যকে আমি তার বন্ধুদের মাধ্যমে হাসপাতালে পাঠাই এবং মারধরকারী (তামিম) একজনকে ধরে রাখি। পুলিশ আসলে তাকে পুলিশের হাতে দিয়ে আমি চলে যাই।

এদিকে শাহবাগ থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনাস্থল থেকে ফোন পেয়ে একজন এসআই ও কনস্টেবল সেখানে যায়। ঘটনার গভীরতা বুঝতে না পেরে তারা আসামিদের ছেড়ে দেয় যেহেতু তারাও রক্তাক্ত ছিল। পরে সাম্যর মৃত্যুর বিষয়টি সামনে আসলে তাৎক্ষণিকভাবে রাতেই অভিযান চালিয়ে রাজধানীর রাজা বাজার এরিয়ার দুইটি হাসপাতাল থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *