২৪টিতে জয়ের সম্ভাবনা বিএনপির

প্রচ্ছদ রাজনীতি

জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬, কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-চাঁদপুর-নোয়াখালী-ফেনী-লক্ষ্মীপুরের ৩৫টি সংসদীয় আসনের পরিস্থিতি, তিন আসনে জামায়াত জেএসডি-এলডিপির সম্ভাবনা, অন্য আসনগুলোতে ত্রিমুখী লড়া

আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। রাজনৈতিক পটভূমি ও সাংগঠনিক কাঠামোর আলোকে কুমিল্লা বিভাগীয় জেলাগুলোর মধ্যে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার আসনগুলোতে ত্রয়োদশ নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এই ছয় জেলায় সংসদীয় আসন রয়েছে ৩৫টি। নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের মাঠে জনমত সৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ছাড়া বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণসংহতি, গণঅধিকার, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিশসহ অন্যান্য দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের গণসংযোগ, আলোচনা সভা, সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগদানের মাত্রা অনেকাংশে বেড়ে গেছে।

ছয় জেলার ৩৫টি আসনে বর্তমানে মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও আসন্ন নির্বাচনে জয় পাওয়ার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে ২৪টিতে বড় কোনো ঝুঁকি ছাড়াই বিএনপি এবং ৩টি আসনে এলডিপি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও জামায়াতে ইসলামীর জয় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাকি আসনগুলোর কোনোটিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এলডিপি, এনসিপি, গণসংহতির মধ্যে দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী লড়াই হবে।
কুমিল্লা জেলা : প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন, পল্লী উন্নয়ন, সমবায় আন্দোলন, খাদি, হস্ত-মৃৎশিল্প, কৃষি, শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে অগ্রসর জনপদ কুমিল্লা জেলায় সংসদীয় আসন রয়েছে ১১টি। বিভিন্ন পর্যায়ের ভোটার ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটযুদ্ধে কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা), কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস), কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর), কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া), কুমিল্লা-৬ (আদর্শ সদর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন), কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) ও কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট-লালমাই) এই সাতটি আসনে ঝুঁকি ছাড়াই বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বাকিগুলোর মধ্যে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে এলডিপি ও কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে জামায়াতে ইসলামীর জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ভোটের লড়াই হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা : প্রাচীনকাল থেকেই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৬টি সংসদীয় আসন রয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ ছড়াচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৬টি আসনে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও নানা পেশার লোকজনের ভোটের ভাবনা থেকে জানা গেছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর), ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ), ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর), ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) এই চারটি আসনে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে বিএনপির সঙ্গে গণসংহতি আন্দোলনের ভোটের লড়াই হবে। এই দুইটি আসনে বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী ও অন্তর্কোন্দলও রয়েছে বলে জানা গেছে।

চাঁদপুর জেলা : বাংলাদেশের প্রথম ব্র্যান্ডিং জেলা চাঁদপুর বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের অংশ। পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত চাঁদপুর জেলায় সংসদীয় আসন রয়েছে ৫টি। চাঁদপুরকে বিএনপির দুর্গ বলা হলেও সময়ের পরিক্রমায় সব উপজেলাতেই জামায়াতে ইসলামীর শক্ত দলীয় অবস্থান দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে চাঁদপুরের ৫টি আসনের তিনটিতে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিদের মতামত থেকে জানা গেছে, চাঁদপুর-১ (কচুয়া), চাঁদপুর-২ (মতলব উত্তর-দক্ষিণ) ও চাঁদপুর-৫ (হাজিগঞ্জ-শাহারাস্তি) আসনে বিএনপির প্রার্থী যাকেই দেওয়া হোক, বড় লড়াই করে হলেও জয় পাবে। তবে চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) ও চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে জামায়াতের সঙ্গে ভোটের মাঠে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠবে সেক্ষেত্রে এই দুইটি আসনে কোন দল জয় পাবেএটি নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল।

নোয়াখালী জেলা : খোলাজা পিঠা ও ভেড়ার গোশতের জন্য বিখ্যাত নোয়াখালী জেলা ৬টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত। আগামী ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৎপর রয়েছেন। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচন ঘিরে ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ৬টি আসনের মধ্যে নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ি), নোয়াখালী-২ (সেনবাগ-সোনাইমুড়ি), নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) ও নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট) আসনগুলো অনেকটা ঝুঁকি ছাড়াই বিএনপির জয়ের ঝুড়িতে যুক্ত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

অপরদিকে নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনে বিএনপি, জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদ প্রার্থীর মধ্যে এবং নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে বিএনপির নেতৃত্বের কোন্দল ও অন্তর্কোন্দল থাকায় এখানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরির জন্য মাঠে রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও নিজেদের বলয়ের বাইরে জনসমর্থন আদায়ের কৌশল হিসেবে ‘হাতিয়া উন্নয়ন ফোরাম’-এর ব্যানারে মাঠে রয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে।

লক্ষ্মীপুর জেলা : সয়াবিন, নারকেল ও সুপারি উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত লক্ষ্মীপুর জেলায় চারটি সংসদীয় আসন রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্মীপুরকে বিএনপির দুর্গ বলা হলেও দলীয় অন্তর্কোন্দলের কারণে এখানে দুইটি আসনে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। আসনগুলো হলো লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর সদর আংশিক)। এই আসন থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া একবার নির্বাচন করেছিলেন বলে এটি ভিআইপি আসন হিসেবে মর্যাদা পায়।
লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনটি বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত। আসন্ন নির্বাচনে এই আসনটিও বিএনপি পাবে বলে স্থানীয় ভোটার ও দলটির নেতাকর্মী, সমর্থকরা আশাবাদী। অপরদিকে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনটিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র প্রার্থী হয়ে অংশ নেবেন বলে জোর আলোচনা চলছে। এই আসনটিতে দলীয় কোন্দল বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসনটিতে বিএনপির সঙ্গে এনসিপি, এলডিপি ও জামায়াতে ইসলামীর ত্রিমুখী লড়াই হবে। লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এখন অনেকটা শক্তিশালী। এই আসনটিতে জেএসডির জয় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফেনী জেলা : বর্তমানে দেশের ধনী জেলাগুলোর মধ্যে পঞ্চম স্থানে থাকা রেমিট্যান্স-সমৃদ্ধ জেলা ফেনীর ছয়টি উপজেলা নিয়ে তিনটি সংসদীয় আসন গঠিত। ফেনী-১ (পরশুরাম-ফুলগাজী-ছাগলনাইয়া), ফেনী-২ (ফেনী সদর) এবং ফেনী-৩ (সোনাগাজী-দাগনভূইয়া) আসন তিনটি ঘিরে ফেনী জেলাকে বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা বলা হয়ে থাকে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার পৈতৃক এলাকার ফেনী-১ (পরশুরাম-ফুলগাজী-ছাগলনাইয়া) আসনটি থেকে বিজয়ী হয়ে তিনবার প্রধানমন্ত্রী এবং দুইবার বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এই আসন থেকে আসন্ন নির্বাচনে শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে খালেদা জিয়া প্রার্থী না হলে দল থেকে যিনিই মনোনয়ন পাবেন, তিনিই জয় পাবেন আসনটিতে। অপর দুইটি আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক নেতা থাকলেও দলটিতে দৃশ্যমান কোন্দল নেই। আসন্ন নির্বাচনে ফেনীর তিনটি আসনই বিএনপি পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *