সেনাপ্রধানের এখতিয়ার ও ভুল-শুদ্ধ বিচার

জাতীয় শিরোনাম

মেহেদী হাসান পলাশ:

বর্তমান সময়ে বিভিন্ন মহলে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন সেনাপ্রধানের বক্তব্যের এখতিয়ার নিয়ে। কেউ কেউ ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স অনুযায়ী তার অবস্থান দেখিয়ে দিচ্ছেন। কেউবা প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি কথা বলতে পারেন কিনা? এই প্রশ্ন তোলার ন্যায্য অধিকার তাদের অবশ্যই আছে এবং সেটি অযৌক্তিক নয়। তার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন করা হালাল, কিন্তু তিনি ভুল বলেছেন না সঠিক বলেছেন বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সেই বিচার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সঠিক বিচার করতে হলে আলোচনাটা শুরু থেকে শুরু করতে হবে।

যেহেতু বিগত জুলাই ২০২৪ থেকে সেনাবাহিনীর ৩০ হাজার সদস্য মাঠ পর্যায়ে মোতায়ন রয়েছে, যদিও এগুলো তাদের আসল কাজ নয়। তবুও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী বিভাগের নির্দেশে তারা এই দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর নিয়মিত দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে অনেক মানুষ বিভিন্ন পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের কাছে অনুরোধ ও আবদার নিয়ে তাদের কাছে যাচ্ছেন। এগুলো রক্ষা করতে গিয়ে কখনো তারা বিতর্কিত হয়ে পড়ছেন। এ ধরনের যেকোনো ঘটনা আবার মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে, যা তাদের পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলছে। সে কারণেই দাবি উঠেছে সেনাবাহিনীকে দ্রুত ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়ার। কিন্তু পুলিশ এখনো সম্পূর্ণরূপে ফাংশনাল না হওয়ায় এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় তারা ব্যারাকে ফিরতে পারছেন না। উল্টো বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচন পাঁচ- দশ বছর এমনকি ইউনুস সাহেবের বাকি জিন্দেগীর মধ্যে না হওয়ার দাবি তোলা হচ্ছে। ফলে তাদের ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে কথা বলা তাদের এখতিয়ার বহির্ভূত কী?

এমনকি আজকেও কিছু মানুষ নির্বাচন ৫ বছর পিছিয়ে দেয়ার দাবিতে মিছিল করছে। অবাক কাণ্ড, যে প্রজন্ম আফসোস করত তাদের জীবদ্দশায় তারা ভোট দিতে পারেনি, দেড় দশকের অধিককাল দেশে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন দেখেনি, তাদেরই একটি অংশ এখন অজানা কাল পর্যন্ত নির্বাচন পেছানোর দাবি তুলেছে। আরো অবাক ব্যাপার, এই দেশে সেনাবাহিনী নির্বাচন চাইছে আর সিভিলিয়ানরা(একাংশ) চাইছে না।

যারা বলছেন রাজনীতির সাথে সেনাবাহিনীর কোন সম্পর্ক নেই, তাদের কাছে এ প্রশ্ন করা যায় যে, ৩৬ জুলাই শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর জেনারেল ওয়াকার যখন সবাইকে সেনাসদরে ডেকেছিলেন, তখন আপনারা সেখানে কেন গিয়েছিলেন? আপনারা তখন কেন বলেননি রাজনীতি ওনার কাজ নয়। আমরা সেনাসদরে না গিয়ে অন্য কোথাও সরকার গঠন করব? ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স অনুযায়ী ১২ নম্বরে অবস্থিত একজন ব্যক্তি কী করে সরকার গঠন করতে পারে? সেদিন তিনি যখন বলেছিলেন, ‘সব দায়িত্ব আমি নিলাম’- তখন এ প্রশ্ন তোলেননি কেন? বরং তখন তাঁর এ কথায় কী আশ্বস্ত হয়েছিলেন? হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন? কেন তাকে সাথে নিয়ে বঙ্গভবনে গিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন? তখন তো বলতে পারতেন তুমি ক্যান্টনমেন্টের মানুষ, সেখানেই থাকো, সরকার গঠন আমাদের কাজ, আমরা গিয়ে সরকার গঠন করব!

সেনাপ্রধান কোন ইন্ডিভিজুয়াল ব্যক্তি নন। তিনি একজন সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সেনাবাহিনী যার নেতৃত্ব দেন সেনাপ্রধান। নিকট অতীতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কেউ সেনাপ্রধানের দিকে তীর নিক্ষেপ করেননি। কিন্তু বর্তমান সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা সরাসরি ভিডিও সাক্ষাৎকারে সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা যাইহোক, এভাবে প্রকাশ্যে বাংলাদেশে কর্মরত কোন সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অর্গান থেকে অভিযোগ করতে দেখা যায়নি। আবার সরকারি দল অর্থাৎ এনসিপি-র গুরুত্বপূর্ণ নেতা হাসানাত আব্দুল্লাহ ফেসবুকে সরাসরি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেন। এসব নিয়ে সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিয়েছে বা সতর্ক করেছে এমন কথা কোথাও শোনা যায়নি। ফলে কারো কারো মনে হতে পারে, এসব বক্তব্যের পিছনে সরকারের প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে।

বিগত ৪-৫ মাস যাবত প্রবাসী ৫-৬ জন ইউটিউবার যারা সরকারের প্রবল সমর্থক এবং তাদের কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত বলে এদের কেউ কেউ নিজেরাই ঘোষণা করেছে- তারা ধারাবাহিকভাবে সেনাপ্রধানকে আক্রমণ করে গিয়েছে। এমনকি সেনাপ্রধানকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য সরকারকে বহুবার নসিহত করেছে। এহেন প্রচারণার ব্যাপারেও সরকার কোন বক্তব্য রাখেনি। তখন কিন্তু আপনারা কেউ বলেননি যে, একজন কর্মরত সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে এভাবে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়া যায় না। এসব কার্যক্রম প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধানের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে কিনা বা করতে ভূমিকা রেখেছে কিনা সে বিচার ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইল।

আমার মনে হয় না দেশে কেউ প্রফেসর ইউনূসের অপসারণ চায়, পদত্যাগ চায়। কিন্তু আল জাজিরায় সাক্ষাৎকারে তিনি যখন বললেন, এই মুহূর্তে দেশের কেও নির্বাচনের দাবী জানাচ্ছে না, মানুষ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী নয়। তখন এ ধরনের কথাবার্তা নির্বাচনমুখী মানুষকে তার ইনটেনশন নিয়ে সন্দিগ্ধ করে তুলেছিল। সংকটের প্যাকেটজাত বীজটা সেখানেই রোপিত হয়েছিল। সেনাপ্রধানও কিছুদিন আগে তার বক্তব্যে ‘নো ইফ, ট নো বাট, টোটাল ফুলস্টপ’ জাতীয় বক্তব্য দিয়েছিলেন। তার এই বক্তব্য দেশবাসী গ্রহণ করেনি। কিন্তু এই বক্তব্যের মাঝেই তিনি সতর্ক করেছিলেন আসন্ন সমূহ বিপদ সম্পর্কে। ঐক্যের তাগাদা দিয়েছিলেন।

সেনাপ্রধানের পক্ষ বা বিপক্ষ নিয়ে আমি কোন কথা বলতে চাইছি না। তার সাথে আমার কোন পরিচয় বা যোগাযোগ নেই। আমি শুধু উদ্ভূত পরিস্থিতির লজিক্যাল বিশ্লেষণ করতে চাইছি, যাতে সংকটের গোড়াটা চিহ্নিত করা যায় এবং সমাধানের রাস্তা বেরিয়ে আসে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুবাদে সেনাপ্রধানের উক্ত সতর্কতার অর্থ বুঝতে আমার দেরি হয়নি। যারা আমার লেখা পড়েন তারা জানেন, আমি বিগত পাঁচ-ছয় বছর ধরে ক্রমাগত বলে আসছি, আমাদের হয়তো মাথা ব্যাথা আছে কিন্তু জটিল রোগ পায়ে। অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামে, কক্সবাজারে, বঙ্গোপসাগরে। সেনাপ্রধান হিসেবে আমার থেকে এ বিষয়গুলো তার আরো ভালো উপলব্ধি করার কথা। তিনি সেই ইঙ্গিতই করেছিলেন। তবে এহেন সতর্কবার্তা দেয়ার পরেও রাজনীতিবিদগণ ঐক্যের পরিবর্তে আরো বিভেদের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছে। বড়, ছোটন চতুরঙ্গীদের ছায়ার ইশারায় রাজা-মন্ত্রী নড়ছে। এহেন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা যাদের দায়িত্বে তারা কথা বলতে বাধ্য হয়ে থাকতে পারে।

বন্দর ও করিডরের মত বিষয় যার সাথে সরাসরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত, সেসব বিষয়ে নিরাপত্তার সাথে জড়িত সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সাথে কোনরূপ আলোচনা বা রিস্ক এনালাইসিস ছাড়াই এককভাবে ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া’ তাদের কতটা এখতিয়ার ছিল এ প্রশ্ন কেউ করেছেন? এভাবেই একদিন শেখ হাসিনা সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও পার্লামেন্টে কোনরূপ আলোচনা ছাড়াই পার্বত্য চট্টগ্রামে তথাকথিত শান্তিচুক্তি করেছিল। এর পরিণাম রাষ্ট্রকে এবং সেখানকার মানুষকে আজও ভুগতে হচ্ছে। আমার জানা মতে, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা সমূহ তাদের অফিসিয়াল চ্যানেলে সরকারকে করিডর দেয়ার নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টি বারবার জানিয়েছে। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারে ‘কারো সাথে চুক্তি না করলেও’ করিডোর বা চ্যানেল দেয়ার ক্ষেত্রে ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে’। এই অবস্থায় দেশকে একটি চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সম্ভাব্য যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আর কী করার ছিল!

৩ আগস্ট ২০২৪ এ ধরনের একটি দরবারের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে সকলের। সেখানে সেনা সদস্যদের অনেককেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দরবারে উপস্থিত সেনা সদস্যরা সবাই সেনাপ্রধানের অবস্থান ও বক্তব্য সমর্থন করেছেন বলে জানা গেছে। এতে বোঝা যায়, এই বক্তব্য তার ব্যক্তিগত নয় বরং সেনাবাহিনীর বক্তব্য। আমরা ঢাকায় বসে যুদ্ধ লাগিয়ে দিতে পারব কিন্তু ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ করবে সেনাবাহিনী। গুলি ছুঁড়বে এবং প্রথম গুলি খাবে সেনাবাহিনীই। কাজেই এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য থাকা খুবই যৌক্তিক। সেখান থেকে জেনারেল ওয়াকারের এই বক্তব্য রাষ্ট্রকে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি ও একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের পথ থেকে ফিরিয়ে নিতে কোনো ভূমিকা রেখেছে কিনা সে বিচার ইতিহাস করবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, সাম্প্রতিক ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমান সময়ে পাকিস্তানের সাথে একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু মোদি সরকার সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে সশস্ত্র বাহিনীকে যুদ্ধে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দেয়। তার ফলাফল, ছয়টি যুদ্ধবিমান, একটি ব্রিগেড ও অসংখ্য সেনাস্থাপনা ধ্বংস এবং বেশ কিছু সেরা সদস্যের মৃত্যু। তার থেকেও বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম দেশ ভারত ও তাদের বিশাল সেনাবাহিনীর উপর যে পরাজয়ের কালিমা লিপ্ত হয়েছে, মোদি তার রক্ত-সিঁদুর গরম করে বাষ্পীভূত করলেও মুছে যাবে না।

৩৬ জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনাকে তাড়াতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিল সবাই। জেনারেল ওয়াকারের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী সেই ভূমিকা রেখেছিলেন। দু’ একটি বিচ্ছিন্ন জায়গায় সেনাবাহিনীর জনগণের উপরে গুলি করলেও সারা বাংলাদেশে মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনী আন্দোলনকারীদের পাশেই দাঁড়িয়েছিল। আজকের বিক্ষুব্ধ ইউটিউবাররা সেদিন সেনাবাহিনীর এই ভূমিকার প্রবল প্রশংসা করে অনেক ভিডিও তৈরি করেছিল। ৫ আগস্ট এর পূর্বে সারা বাংলাদেশের রাজপথে আন্দোলনকারীরা মিছিল করেছে, “এই মুহূর্তে দরকার-সেনাবাহিনীর সরকার।” সেনাবাহিনীর সদস্যদের সামনে এমনকি তাদের ট্যাংকের উপর উঠে সবাই এই স্লোগান দিয়েছে। সেদিন কিন্তু এই শ্লোগানের এখতিয়ার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি।

জনতার দাবি মেনে শেখ হাসিনাকে তাড়িয়ে সেদিন যদি সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিত আমার মনে হয় না ৫ আগস্ট এ নিয়ে কারো আপত্তি থাকতো। আমি তো রাজপথেই ছিলাম, জেনে শুনে এবং বুঝেই বলছি, অন্তত ৫ আগস্ট সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিলে কেউই নারাজ হতো না। কিন্তু জেনারেল ওয়াকার সেই লোভ, সেই উস্কানি থেকে নিজেকে এবং নিজের বাহিনীকে নিবৃত রেখেছিলেন। ৫ আগস্ট এর পর জেনারেল ওয়াকারের ভূমিকা নিয়ে আজকের সমালোচকেরা অসংখ্য প্রশংসামূলক পোস্ট করেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু সেদিন যদি জনতার দাবি মেনে সেনাবাহিনী সরকার গঠন করত তাহলে আজকে ডক্টর ইউনূসের চেয়ারে থাকতেন জেনারেল ওয়াকার। রাজনীতি, সংবিধান, এখতিয়ার ও ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স সেদিন কারো মাথায় ছিল না। কিন্তু জেনারেল ওয়াকারের মাথায় ছিল।

ইনকিলাব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *