খবর ৫২ ,প্রতিবেদক
১৩ আগস্ট ২০২৫, ১৯:৪৮

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে সাবেক তিন গভর্নর ও ছয় ডেপুটি গভর্নরের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুরোধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ তদন্তের মাধ্যমে সাবেক এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
সাবেক গভর্নরদের তালিকায় রয়েছেন ড. আতিউর রহমান, ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদার। অন্যদিকে, সাবেক ডেপুটি গভর্নরদের মধ্যে রয়েছেন সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী (এসকে সুর), মাসুদ বিশ্বাস, এসএম মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান, কাজী ছাইদুর রহমান এবং আবু ফরাহ মোহাম্মদ নাছের। এদের মধ্যে এসকে সুর ও মাসুদ বিশ্বাস বর্তমানে দুদকের মামলায় কারাগারে আটক রয়েছেন।
সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাংকিং খাতে যে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, তার নেতৃত্বে ছিলেন এই গভর্নররা। ড. আতিউর রহমানের সময়কালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে মারাত্মক দুর্বলতা দেখা দেয়। তার আমলেই ঘটে যায় হলমার্ক ও বেসিক ব্যাংক জালিয়াতির মতো বড় বড় অনিয়ম। সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হিসেবে রয়ে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা, যার পেছনে আতিউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বেসরকারি উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ফজলে কবিরের সময়কালে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ আরও শিথিল হয়ে পড়ে। তার সময়েই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দখলের ঘটনা ঘটে। গভীর রাতে ও বাসায় বসে এস আলম গ্রুপকে এই ব্যাংকগুলো দখলের অনুমোদন দেন তিনি। এরপর থেকে এসব ব্যাংকে লুটপাটের মহোৎসব শুরু হয়। তার আমলেই ঋণ নীতিমালায় ছাড় দিয়ে খেলাপি ঋণ গোপন করা এবং সুদের হার ৯ শতাংশে আটকে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সময়ে নামমাত্র টাকা দিয়ে খেলাপি থেকে মুক্ত থাকার পদ্ধতি চালু হয়, যা পরবর্তীতে ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করে।
আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়কালে ব্যাংকিং খাতের সংকট আরও গভীর হয়। তিনি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র দুই বছরের মধ্যে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন। তার আমলেই ঋণখেলাপিদের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়, যা ব্যাংকিং খাতে আরও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এ সময়ে এস আলম গ্রুপের ব্যাংকগুলোকে টাকা ছাপিয়ে দেওয়ার ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি গোপন স্থান থেকে পদত্যাগ করেন এবং বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে, সাবেক ডেপুটি গভর্নরদের মধ্যে এসকে সুর ও মাসুদ বিশ্বাস ইতিমধ্যেই দুদকের মামলায় কারাবরণ করছেন। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান দায়িত্ব পাওয়ার পর ব্যাংকগুলোর পরিদর্শন বন্ধ করে দেন, যা ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম বাড়াতে সহায়তা করে। আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসানের সময়ে অর্থপাচার বেড়ে যায়, কিন্তু তিনি এ বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। কাজী ছাইদুর রহমান ডলার বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে অভিযুক্ত। আর আবু ফরাহ মোহাম্মদ নাছের ঋণ নীতিমালা শিথিল করে পুরো ব্যাংক খাতকে বিপর্যস্ত করে ফেলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে আতিউর রহমান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে জানা গেছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তার পাসপোর্ট ব্লক করেছে সরকার। ফজলে কবির দেশে রয়েছেন, কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর তাকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। আব্দুর রউফ তালুকদার গত ৫ আগস্ট থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
বিএফআইইউর এই তদন্তকে কেন্দ্র করে ব্যাংকিং মহলে এখন উত্তেজনা বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই তদন্তের মাধ্যমে সাবেক এই উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তাদের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। এ তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছে অর্থউপদেষ্টা।
