সম্পাদকীয়: ঐক্যের পথে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ—জুলাই সনদের স্বাক্ষর

জাতীয় শিরোনাম

খবর৫২ঃ দীর্ঘ আলোচনা, বিতর্ক আর সংশয়ের পর্ব পেরিয়ে আজ ১৭ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হলো বহু প্রতীক্ষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং দেশের ২৫টিরও বেশি রাজনৈতিক দল ও জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের পথে বাংলাদেশ এক নতুন অভিযাত্রা শুরু করল। এই সনদ কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতির দলিল।

ঐকমত্যের দীর্ঘ পথ পরিক্রমা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের অপরিহার্যতা উপলব্ধি করেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। কমিশনের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সাথে দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমন—রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য ৮৪টিরও বেশি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। এই আলোচনাগুলো ছিল কঠিন, কারণ বহু দল তাদের নিজস্ব মতাদর্শ ও স্বার্থের জায়গা থেকে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছে। ফলস্বরূপ, সনদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন—প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, উচ্চকক্ষ (সিনেট) গঠন এবং সাংবিধানিক পদে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আবার, কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) লিপিবদ্ধ রেখেই ঐকমত্যের পথে এগিয়ে যেতে হয়েছে, যা গণতন্ত্রে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধারও প্রমাণ বহন করে।

আজকের অনুষ্ঠানের চিত্র: উচ্ছ্বাস ও বর্জন

আজকের এই ঐতিহাসিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি একইসাথে উচ্ছ্বাস এবং এক ধরনের রাজনৈতিক বিভাজন—দু’টি বিপরীত চিত্রই ধারণ করেছে।

সাফল্যের দিক: দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-সহ ২৫টি দল সনদে স্বাক্ষর করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, সংস্কারের মূল কাঠামো ও গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্বাক্ষর শেষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস সনদটিকে ‘নতুন বাংলাদেশের জন্ম’ বলে আখ্যায়িত করেন, যা এই দলিলের গুরুত্ব তুলে ধরে। জামায়াতে ইসলামী আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করার দাবি জানালেও শেষ পর্যন্ত তারা সনদে স্বাক্ষর করে ঐকমত্যের প্রতি তাদের আস্থা প্রকাশ করেছে।

বিরোধিতা ও বিতর্ক: অনুষ্ঠানটি বিতর্ক থেকে মুক্ত ছিল না। জুলাই অভ্যুত্থানের অগ্রভাগে থাকা ছাত্রনেতাদের প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাম ধারার চারটি রাজনৈতিক দল (সিপিবি, বাসদ-সহ) এই অনুষ্ঠান বর্জন করে। তাদের মূল আপত্তি ছিল—সনদকে আইনি ভিত্তি বা সাংবিধানিক স্বীকৃতি না দিয়ে কেবল স্বাক্ষরের মাধ্যমে একটি ‘আনুষ্ঠানিকতা’ সম্পন্ন করা হচ্ছে। তাদের মতে, নির্বাচিত সরকার এলে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন নাও করতে পারে। এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম সরাসরি অভিযোগ করেন যে, আইনি ভিত্তি ছাড়া স্বাক্ষর জনগণের সাথে এক ধরনের প্রতারণা।

এছাড়াও, স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়দানকারী একটি অংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। তারা অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে বিক্ষোভ করছিল। এই ঘটনাটি আনন্দঘন পরিবেশের মাঝে এক কালো ছায়া ফেলে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যাশা ও ক্ষোভের একটি চিত্র তুলে ধরে।

আমাদের প্রত্যাশা: এবার বাস্তবায়নের পালা

জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, তবে এটি কেবল একটি সূচনা। বহু আলোচনা শেষে প্রাপ্ত এই ঐকমত্যকে এখন বাস্তবে রূপ দিতে হবে। সনদে অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো কার্যকর করার জন্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করে জনগণের গণভোটের মাধ্যমে তা অনুমোদন করার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, জনগণ সেই প্রক্রিয়ার দ্রুত বাস্তবায়ন চায়।

যে দলগুলো (এনসিপি ও বাম দলসমূহ) আজ স্বাক্ষর থেকে বিরত রইল, তাদের আপত্তিকে উপেক্ষা না করে তাদের সঙ্গে আলোচনা ও সংলাপের পথ খোলা রাখা উচিত। অন্যদিকে, তাদেরও মনে রাখতে হবে—গণতন্ত্রে উত্তরণের এই সুযোগ অহেতুক শর্ত বা ‘প্যাচাল’ করে বিনষ্ট করা জাতির সঙ্গে বেইমানি হবে।

এখন সময় এসেছে বিভেদ ভুলে গিয়ে সংস্কারের কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার। জুলাই সনদ কেবল একটি কাগজ নয়, এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের প্রতিজ্ঞা। এই প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়িত হলেই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে এবং দেশ স্থিতিশীল গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *