শোকের নীরবতায় ঢাকা: এক নেত্রীর বিদায়ে স্তব্ধ শহর

প্রচ্ছদ

ঢাকা আজ অন্য রকম। চেনা শহর, চেনা রাস্তা—তবু সবকিছু যেন অচেনা। কোলাহলমুখর রাজধানী আজ ভারী নীরবতায় আচ্ছন্ন। বাতাসে ভাসছে এক ধরনের শূন্যতা, মানুষের চোখেমুখে গভীর বিষণ্ণতা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান পুরো দেশ।

রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণার প্রথম দিনেই তার স্পষ্ট ছাপ দেখা গেছে রাজধানীর সর্বত্র। সকাল থেকেই অনেক দোকানপাট বন্ধ, রাস্তায় যানবাহনের চলাচল সীমিত। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। যারা বেরিয়েছেন, তাদের কথাবার্তায় বারবার ফিরে আসছে একটি নাম—খালেদা জিয়া। কারও কণ্ঠে স্মৃতিচারণা, কারও কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস, কোথাও কোথাও চাপা ক্ষোভ আর আক্ষেপ।

মা, মাটি ও মানুষের রাজনীতিতে যিনি ছিলেন অনড় ও আপসহীন, সেই খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য উত্থান-পতন, সংঘাত আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই নারী ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনিবার্য অধ্যায়। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছায়নি, বরং পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের এক দৃঢ় দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছিলেন। তার মৃত্যুতে কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয়, একটি সময়েরও অবসান ঘটেছে—এমনটাই মনে করছেন অনেক মানুষ।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ আজ যেন শোকের প্রতীকী ঠিকানা। সকাল থেকেই সেখানে মানুষের ঢল। কেউ দলীয় পরিচয়ে, কেউ নিছক ভালোবাসা থেকে, কেউবা কৌতূহল আর আবেগের টানে এসেছেন শেষবারের মতো এই নেত্রীকে বিদায় জানাতে। কারও হাতে পতাকা, কারও চোখে অশ্রু। যারা কাছে যেতে পারছেন, তারা নীরবে তাকিয়ে থাকছেন; আর যারা দূরে দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের মুখেও একই প্রশ্ন—আর একবার দেখা যাবে তো?

যারা সেখানে যেতে পারেননি, তারাও মানসিকভাবে উপস্থিত। টেলিভিশনের পর্দা বা মোবাইল ফোনের লাইভ সম্প্রচারে চোখ রেখে তারা নীরবে বিদায় জানাচ্ছেন। শহরের নানা প্রান্তে মানুষ থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে সেই দৃশ্য—কখনো চোখ মুছছে, কখনো দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলছে।

রাজধানীর গোদারাঘাট এলাকায় ফুটপাতে একটি ছোট চায়ের দোকান। প্রতিদিনের মতো দোকান খোলা থাকলেও আজ বিক্রি কম। চা বিক্রেতা সিরাজুল ইসলাম বললেন, রাতে তিনি ঠিক করেছিলেন জানাজায় যাবেন। কিন্তু সকালে উঠে আর যেতে পারেননি। কথা বলতে বলতে গলা ভারী হয়ে আসে তার। বলেন, ‘মনটা ভালো লাগছিল না। উনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমার তো মনে হয়, দেশের একটা মানুষেরও তার প্রতি রাগ নেই।’

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ভবনের সিকিউরিটি গার্ড আব্দুল মজিদ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তবু এই মৃত্যু তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘অনেক নেতা দেখেছি, কিন্তু খালেদা জিয়ার মধ্যে আলাদা একটা মানবিক দিক ছিল। তিনি উদার মনের মানুষ ছিলেন। তার ওপর যে কষ্ট গেছে, সেই কষ্টই তাকে ভেঙে দিয়েছে।’
এমন কথা শুধু এই চায়ের দোকানে নয়—বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত, বাজার, অফিসের ফটক—সবখানেই শোনা যাচ্ছে। রাজনীতি এখানে আর কেবল দলীয় হিসাব নয়, হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ। মানুষ কথা বলছে স্মৃতি নিয়ে, আক্ষেপ নিয়ে, প্রশ্ন নিয়ে।

সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে লাল-সবুজ পতাকায় মোড়ানো ফ্রিজার ভ্যানে করে খালেদা জিয়ার মরদেহ নেওয়া হয় তার গুলশানের বাসভবনে। সেখান থেকে দুপুরে মরদেহ পৌঁছায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। আজ দুপুর ২টায় সেখানে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিকাল সাড়ে ৩টায় তাকে সমাহিত করা হবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে।

আজ বাংলাদেশ কাঁদছে। কেউ প্রকাশ্যে, কেউ নীরবে। এই শোকের ভেতরেই ঘুরপাক খাচ্ছে নানা মূল্যায়ন, নানা প্রশ্ন। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে একটি সত্য স্পষ্ট—খালেদা জিয়া ছিলেন এমন এক রাজনৈতিক চরিত্র, যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ ইতিহাসও পাবে না।

এক জীবনের অবসান মানেই সব শেষ নয়। স্মৃতিতে, আলোচনায়—খালেদা জিয়া থাকবেন বহুদিন। আর আজ, এই দিনে—ঢাকা নীরব। বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *