
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত উত্তরপ্রদেশ (ইউপি) রাজ্যে ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন মুসলমানরা। রাজ্যটিতে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী নীতির অধীনে মুসলিম এবং বিশেষ করে যুব কর্মীরা দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার ও প্রান্তিককরণের শিকার হচ্ছেন।
ঈদে-মিলাদুন্নবী (সাঃ)-এর শোভাযাত্রার সময় “আই লাভ মুহাম্মদ” (সাঃ) পোস্টার প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে কঠোর দমন-পীড়ন, গণগ্রেপ্তার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। বরেলি ও কানপুরের মতো শহরগুলিতে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য এফআইআর দায়ের করা হয়েছে, ৬০ জনেরও বেশি মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মুসলিমদের ধর্মীয় প্রকাশের প্রতি বিজেপি-শাসিত রাজ্যটির শূন্য-সহনশীল নীতি প্রতিফলিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।
আটককৃতদের মধ্যে ইত্তেহাদ-এ-মিল্লাত পরিষদের সভাপতি মাওলানা তৌকির রাজা খান রয়েছেন। সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি তাকে আটক করায় সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের জন্য মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু করার একটি বৃহত্তর প্রবণতা প্রতিফলিত হয়েছে।ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তার প্রতি এটি বিশ্বাসঘাতকতাকে তুলে ধরেছে।
এই সপ্তাহে উত্তর প্রদেশের জৌনপুর জেলার মুয়ারকি গ্রামে প্রশাসন বর্তমান গ্রাম প্রধান সাদিক আহমেদের বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট শৈলেন্দ্র কুমারের তত্ত্বাবধানে এবং তেহসিলদার আদালতের আইনি নির্দেশে কড়া পুলিশি পাহারায় এই ভাঙার কাজ সম্পন্ন করা হয়। কর্মকর্তারা দাবি করেন, প্রায় আট বিঘা সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করা হয়েছিল, যা এখন পরিষ্কার করা হয়েছে।
তবে গ্রামবাসীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। মোহাম্মদ জিমিল বলেন, “এটা স্পষ্ট বৈষম্য। এখানে শত শত অবৈধ দখল করা বসতি রয়েছে। কিন্তু শুধু মুসলিম প্রধানের বাড়িকেই নিশানা করা হলো। দেশটির সুপ্রিম কোর্টের ভাঙার ওপর দেওয়া স্থগিতাদেশকেও উপেক্ষা করেছে প্রশাসন।
এর আগে, উত্তর প্রদেশের সাম্ভাল জেলায় ‘ছোট্টি মসজিদ’ নামে পরিচিত একটি ৩০ বছরের পুরনো মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। এই ঘটনা মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সেদাংলি-মানোটা রোডে শ্রী কল্কি ধামের কাছে অবস্থিত এই মসজিদটি ভারী পুলিশ মোতায়েন করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
ভারতের অবৈধভাবে অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের বিজেপির একজন জ্যৈষ্ঠ মুসলিম নেতা ডঃ জাহানজেব সিরওয়াল উত্তরপ্রদেশ সরকারের প্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়েছেন। সিরওয়াল ব্যাপক আটক, অন্যায় এফআইআর এবং উস্কানিমূলক বক্তব্যের সমালোচনা করে সতর্ক করে বলেন, দল যদি ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয় তবে তিনি পদত্যাগ করবেন। তার এই অবস্থান হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অধীনে বিশ্বাস ও রাজনৈতিক আনুগত্যের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাকে স্পষ্ট করে।
অন্যান্য মুসলিম পন্ডিত ও নেতারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত ধর্মতত্ত্ব অধ্যাপক মুফতি জাহিদ আলী খান সম্প্রদায়ের উপর চাপানো ভয়ের পরিবেশের বিষয়টি তুলে ধরেন। অন্যদিকে মাওলানা আবদুল হামিদ নোমানি ভারতের বহুত্ববাদী পরিচয়ের জন্য ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেন। এমনকি আবাদ শাহ-এর মতো তরুণ কর্মীরাও রাজ্য কর্মকর্তাদের সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের সমালোচনা করার জন্য দমনের শিকার হয়েছেন, যা ভিন্নমতাবলম্বী মুসলিম কণ্ঠস্বরকে পদ্ধতিগতভাবে দমন করার বিষয়টি প্রতিফলিত করে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই পদক্ষেপগুলির নিন্দা জানিয়েছে, এই দমন-পীড়নকে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল বলে বর্ণনা করেছে।
