বিজেপির সর্বশেষ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ভারতে নয়া টার্গেট সম্রাট আওরঙ্গজেবের কবর

আন্তর্জাতিক শিরোনাম

ভারতের নাগপুরের দত্ত শির্কে তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। সেখানে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে তার বাসস্থানের গলিতে রাখা যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মাত্র এক মাইল দূরে, আসলামও একইভাবে আতঙ্কিত। কারণ, পুলিশ নির্বিচারে নিরীহ মুসলমানদের আটক করছে।


শির্কে এবং আসলাম উভয়ই নাগপুরের বাসিন্দা, যেটি পশ্চিম ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের ত্রিশ লাখ লোকের শহর। সোমবার এখানে ১৭ শতকের মুঘল শাসক আওরঙ্গজেবের কবরের ভবিষ্যৎ নিয়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিমধ্যে, পুলিশ কারফিউ জারি করেছে এবং ৩০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাগপুর সফরের আগে ৫০ জনেরও বেশি লোককে, যাদের বেশিরভাগই মুসলিম, গ্রেপ্তার করেছে। এই নাগপুরেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদর দপ্তর অবস্থিত, যা মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ মিত্রদের আদর্শিক জনক।


গত সপ্তাহে, মহারাষ্ট্রের একজন বিজেপি সাংসদ মুঘল সম্রাটের কবর ভেঙে ফেলার আহ্বান জানান। অতি-ডানপন্থী গোষ্ঠী বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর সাথে যুক্ত প্রায় ১শ’ স্বেচ্ছাসেবক আওরঙ্গজেবের কবর ভেঙে ফেলার দাবিতে সোমবার একটি বিক্ষোভ করে এবং সবুজ কাপড়ে মোড়া কুশপুত্তলিকা দাহ করে। তাদের দাবি, আওরঙ্গজেব ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত তাঁর রাজত্বকালে তিনি হিন্দুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছিলেন এবং তাদের উপাসনালয়গুলি আক্রমণ করেছিলেন।


গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে কুশপুত্তলিকা মোড়ানো সবুজ কাপড়ে কুরআনের আয়াত লেখা ছিল, যা মুসলমানদের ক্ষুব্ধ করে। ফলে, মুসলিমদের একটি দল পাল্টা প্রতিবাদ করে দাবি করে যে, পুলিশ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করুক। এলাকাটির বাসিন্দা আইনজীবী ও মহারাষ্ট্র বার কাউন্সিলের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আসিফ কুরেশি আল জাজিরাকে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, শীঘ্রই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ক্ষুব্ধ মানুষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।’
মঙ্গলবার, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাদনাবিস সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউড ছবি ছাওয়া-এর কথা বলেন, যেখানে আওরঙ্গজেবকে খলনায়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা হিন্দুদের অনুভূতিতে উসকানি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারে। ছবিটি মুঘল শাসক এবং বর্তমান মহারাষ্ট্রের বৃহদাংশ শাসনকারী মারাঠাদের মধ্যে লড়াইয়ের কাল্পনিক চিত্র তুলে ধরেছে। মোদীর বিজেপির সদস্য ফাদনবিস বলেন, ছবিটি আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভকে সামনে এনেছে।


এরআগে, ২০২৪ সালে, একটি মিছিলে আওরঙ্গজেবের পোস্টার ব্যবহারের জন্য চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের জুনে, শাসকের উপর একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টের ফলে ১৪ বছর বয়সী এক মুসলিম কিশোরকে জেলে খাটতে হয়। ২০২২ সালে, মোদী সরকার ভারতের মাধ্যমিক এবং উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করে আওরঙ্গজেব এবং তার পূর্বপুরুষদের মতো সম্রাটদের কৃতিত্বের বিবরণী লেখা একটি তালিকা সহ মুঘল সাম্রাজ্য সম্পর্কে অধ্যায়গুলি থেকে বহু অংশ মুছে ফেলে।


এখন, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা দাবি করছে যে, উত্তর প্রদেশে মোদীর সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা বারাণসীতে জ্ঞানবাপী মসজিদটি বিশ্বনাথ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের উপর নির্মিত, যা ১৬৬৯ সালে আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ধ্বংসপ্রাপ্ত ১৬ শতকের একটি বিশাল হিন্দু মন্দির।


উল্লেখ্য, আওরঙ্গজেব ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে শাসন করা সবচেয়ে শক্তিশালী শাসকদের একজন এবং তাঁর কবর নাগপুরে নেই। এটি রয়েছে এলাকাটি থেকে ৪৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত আওরঙ্গবাদ শহরে, যার ২০২৩ সাল থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে ছত্রপতি সম্ভাজিনগর।


২০২২ সালে বারাণসীতে একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে মোদী আওরঙ্গজেবের নৃশংসতা, তার সন্ত্রাস সম্পর্কে কথা বলেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, আওরঙ্গজেব তরবারির সাহায্যে সভ্যতা পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছিলেন এবং ধর্মান্ধতা দিয়ে ভারতের সংস্কৃতিকে চূর্ণ করার চেষ্টা করেছিলেন। মোদী এরপর থেকে আরও কয়েকবার তার নাম উচ্চারণ করেন। এর জের ধরে, নাগপুরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায়, বাসিন্দা এবং স্থানীয় অধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন যে আরও সহিংসতা ঘনিয়ে আসতে পারে। সূত্র: আল জাজিরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *