ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে হিন্দু নিপীড়ন নিয়ে যা বলেছিলেন তুলসী গ্যাবার্ড

আন্তর্জাতিক শিরোনাম

ভারতীয় গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে কথিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ এনে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড। গতকাল সোমবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ওয়ার্ল্ডকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইসলামিক খেলাফত নিয়ে তিনি বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেন। তার এসব মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার।



তুলসী গ্যাবার্ড একসময় ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদস্য। রাজনীতি করেছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে। ২০২২ সালে তুলসী ডেমোক্রেটিক পার্টি ছাড়েন। যোগ দেন রিপাবলিকান পার্টিতে। তুলসীর সাথে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ইসকনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।


তুলসীর মা হিন্দু মতাদর্শে দীক্ষা নেন এবং তার সব সন্তানের হিন্দু নাম দেন। তুলসীও নিজেকে হিন্দু হিসেবে পরিচয় দেন। মার্কিন কংগ্রেসে তিনিই প্রথম হিন্দু সদস্য। আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় ভগবত গীতা হাতে শপথ নিয়েছিলেন তিনি।



ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে বাংলাদেশে কথিত হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ এনে মার্কিন কংগ্রেসে ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই একটি প্রস্তাব আনেন তৎকালীন এই কংগ্রেস সদস্য। খুনি হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ভারতীয় কিছু মিডিয়ায় পুরনো সেই রেজুলেশনটি নিয়ে ড. ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে নির্লজ্জভাবে প্রোপাগাণ্ডা চালায়।


এটি এমনভাবে প্রচার করা হয়, যেন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ হয়েছে বা হিন্দুদের উপর নির্যাতনের এই অভিযোগ সম্প্রতি আনা হয়েছে। অথচ এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয় তৎকালীন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের শাসনামলে।



‘‘বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার আহ্বান’’ শিরোনামে সেই প্রস্তাবনায় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন কংগ্রেস সদস্য তুলসী বলেন, বাংলাদেশে ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে নির্যাতন ভোগ করে চলেছে এই জনগোষ্ঠীগুলো।



এতে বলা হয়, এই নির্যাতনের সূচনা ঘটে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে হিন্দু শিক্ষার্থীদের উপর নির্মম আক্রমণ চালায়, যেখানে প্রথম রাতেই ৫-১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই অভিযান ১০ মাস ধরে চলে, যার ফলে দুই থেকে তিন মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু এবং ১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। মার্কিন সিনেটর টেড কেনেডি সেসময় বাংলাদেশি শরণার্থীদের সঙ্গে দেখা করে এ পরিস্থিতিকে ‘সন্ত্রাসের সুনির্দিষ্ট অভিযান এবং গণহত্যার ফলাফল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।



সেই প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও ইসলামি চরমপন্থীদের দ্বারা হিন্দু, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও মুক্তচিন্তকদের উপর নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক ঘটনায়, শতাধিক চরমপন্থী দল বাংলাদেশে হিন্দু মন্দির আক্রমণ, ট্রেন ধ্বংস, সরকারি ভবন, প্রেস ক্লাব এবং গণপরিবহনে অগ্নিসংযোগ করেছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অন্যান্য দেশেও দেখা গেছে। তৎকালীন মার্কিন কংগ্রেসের এই সদস্যের মতে, এই পরিস্থিতি রুখতে আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।



উল্লেখ্য, রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তুলসীকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে মনোনীত করেন। গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দায়িত্ব নেন।



৪৩ বছর বয়সী তুলসীর মনোনয়ন নিয়ে নানা তর্কবিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা হয়। তাঁর ব্যাপারে খোদ রিপাবলিকান পার্টির অনেকে আপত্তি জানান। তাকে নিয়ে উদ্বেগ জানান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রায় ১০০ কূটনীতিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা।তবে শেষ পর্যন্ত তুলসীর মনোনয়ন মার্কিন সিনেটে অনুমোদন পায়।



আগে থেকে তুলসীর গোয়েন্দা বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা নেই। তবে দুই দশকের বেশি সময় মার্কিন বাহিনীতে একজন সেনাসদস্য হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তার।



তুলসী বিয়ে করেছেন আব্রাহাম উইলিয়ামস নামের এক সিনেমাটোগ্রাফারকে। তুলসীর বাবার নাম মাইক গ্যাবার্ড। মেয়ের মতো বাবারও দলবদলের ইতিহাস রয়েছে। তিনি প্রথমে রিপাবলিকান পার্টি থেকে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগ দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *