প্রধান পরিচালন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শেয়ার ব্যবসার অভিযোগ

জাতীয় শিরোনাম

দেশের বৃহত্তম পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির (ডিএসই) চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা তাদের ওপর নির্ভরশীল আট ধরনের নিকটাত্মীয় (বাবা-মা, স্ত্রী-স্বামী, ছেলেমেয়ে, ভাইবোন, শ্বশুর-শাশুড়ি ও শ্যালক-শ্যালিকা) কোনোভাবেই সিকিউরিটিজ বা শেয়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হতে পারবেন না। এমনকি ডিএসইতে যোগদানের আগে কোনো শেয়ার ব্যবসা বা বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব থাকলে, চাকরিতে প্রবেশের আগেই তা বন্ধ (ক্লোজ) করার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কিন্তু ডিএসইর বর্তমান প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মোহাম্মাদ আসাদুর রহমানের বিরুদ্ধে এই নিয়মনীতি ও চাকরিবিধি ভেঙে বছরের পর বছর শেয়ার ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) থেকে সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে, আসাদুর রহমান নিজের নামেই দুটি ব্রোকারেজ হাউসে মোট চারটি বিও হিসাব পরিচালনা করেছেন।

জানা গেছে, ২০১০ সালে সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) হিসেবে ডিএসইতে যোগ দেন মোহাম্মাদ আসাদুর রহমান। ডিএসইর তৎকালীন কোম্পানি সেক্রেটারি শেখ মোহাম্মদ উল্লাহর হাত ধরে বোর্ড ও কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টে যোগ দিলেও নিয়ম অনুযায়ী নিজের আগের বিও হিসাবগুলো বন্ধ করার কোনো তাগিদ অনুভব করেননি তিনি। কোনো কোনো বিও হিসাব তিনি চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রায় ছয় বছর পর পর্যন্ত সচল রেখে ব্যবসা চালিয়ে গেছেন।

আসাদুর রহমানের ৪টি বিও হিসাবের বিবরণ : ট্রাস্টি সিকিউরিটিজ লিমিটেডে তার তিনটি বিও হিসাব ছিল। হিসাব নম্বর ১২০২২৪০০০৪১৭৫৮৪০। তিনি হিসাবটি ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিচালনা করেছেন। আরও দুটি হিসাব নম্বর ১২০২২৪০০১২৯৮২৭৩৩ এবং ১২০২২৪০০১৪৮৯১৫৩৮Ñ যা পরিচালনা করেছেন ২০১২ সালের ১২ জুলাই পর্যন্ত। এ ছাড়া মোনা ফিন্যান্সিয়াল কনসালটেন্সি নামক হাউসে তার একটি বিও হিসাব ছিল, সেটির নম্বর ১২০১৪৭০০২৬১৮৪৭২৩। সেটিও ২০১২ সালের ৪ জুলাই পর্যন্ত পরিচালনা করেছেন।

ডিএসইর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতীতে বিও হিসাব সচল রাখা ও সময়মতো ক্লোজ না করার অপরাধে চিফ রেগুলেটরি অফিসার (সিআরও) শওকত জাহান খানকে মাত্র কয়েক সপ্তাহ চাকরির পরই বিদায় নিতে হয়েছিল। অথচ আসাদুর রহমান সবাইকে আইন পরিপালনে বাধ্য করলেও নিজে থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ডিএসইর ৭৪ বছরের ইতিহাসে এমন নিয়ম-বহির্ভূত সুবিধা ভোগের নজির আর নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

পদোন্নতি ও নজিরবিহীন ছাঁটাইয়ের নেপথ্যে : অভিযোগ রয়েছে, ২০১০ সালে যোগদান করে একের পর এক বিদেশ সফর, দ্রুত প্রমোশন, নিয়ম ডিঙিয়ে বেতন বৃদ্ধি ও বাড়তি ইনক্রিমেন্ট সুবিধা ভোগ করেছেন আসাদুর রহমান। শুধু তাই নয়, যার হাত ধরে প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন, তাকেই সরিয়ে একপর্যায়ে কোম্পানি সেক্রেটারির চেয়ার দখল করেন। সর্বশেষ কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ (সিওও) বাগিয়ে নেন, যার মাসিক বেতন ৫ লাখ টাকা। এর কয়েক সপ্তাহ পার না হতেই রহস্যজনকভাবে তার বেতন আরও ১ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৬ লাখ টাকা করা হয়।

এদিকে, গত ২৫ জুন ডিএসইর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে আটজন কর্মকর্তাকে (যার মধ্যে চারজন উপমহাব্যবস্থাপক) চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এই নজিরবিহীন ছাঁটাইয়ের পেছনেও সিওও আসাদুর রহমানের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা কাজ করেছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। তিনি নিজেই একজনের হাতে চাকরিচ্যুতির চিঠি ধরিয়ে দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, আসাদুর রহমানের সঙ্গে ব্যক্তিগত বনিবনা না হওয়ার কারণেই মূলত আব্দুল লতিফ, আব্দুর রাজ্জাক, মমতাজুল হক ও মিলন মিয়াকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কোনো কাজ না দিয়ে বসিয়ে রেখে ছাঁটাইয়ের পথ তৈরি করা হয়।

সিন্ডিকেটের কবলে ডিএসই প্রশাসন : সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন নিয়মিত এমডির পদ খালি থাকার পর গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে নুজহাত আনোয়ার প্রথম নারী এমডি হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু এই ছাঁটাইয়ের নীলনকশা আসাদুর রহমান বেশ আগেই চূড়ান্ত করে রেখেছিলেন। বর্তমানে তা বাস্তবায়ন করছেন মানবসম্পদ বিভাগের জিএম হাসান তারেক চৌধুরী এবং এমডি নুজহাত আনোয়ার। মূলত আসাদুর রহমানকে আড়াল করতেই এই প্রক্রিয়ায় মানবসম্পদ বিভাগকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে মানবসম্পদ বিভাগের সাবেক প্রধান হারুন অর রশিদ পাঠানকে সরিয়ে সেখানে আসাদুর রহমানের অনুগত সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন রেজাকে বসানো হয়।

সর্বশেষ পাকিস্তান সফরে নিয়মের বাইরে গিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করেন আসাদুর রহমান। দেশে ফিরে সেই খরচের বিল অনুমোদনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সদ্য চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা মো. আব্দুল লতিফ। এই কারণেই লতিফসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের কর্মহীন করে শেষে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ও হতাশ সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদ ইকবাল হাসান আমাদের সময়কে বলেন, ডিএসইতে চাকরিরত অবস্থায় বিও হিসাব থাকতে পারে না। এটি আইনের লঙ্ঘন। তবে, বিশেষ প্রয়োজনে রাখতে চাইলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ঘোষণা দিতে হবে। সেটি তিনি না করে বিও হিসাব পরিচালনা করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে ডিএসইর সিওও মোহাম্মাদ আসাদুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, এটি আমার অনিচ্ছাকৃত ভুল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *