বিএনপির কাছে শরিকদের মূল্যায়ন প্রত্যাশা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো শরিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসছেন। আগামী ২০ জুলাই সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিতব্য বৈঠক নিয়ে শরিকদের মধ্যে আগ্রহ ও শঙ্কা দুই-ই রয়েছে। বিএনপির সঙ্গে শরিকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই শঙ্কা। তবে জোট যতদিন আছে, ততদিন প্রাপ্য মূল্যায়ন চায় শরিকরা।
সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী দলগুলোর বাইরে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের এ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে
৪২টি রাজনৈতিক দল সক্রিয় ছিল। নির্বাচনে শরিকদের মধ্যে ১১টি দলকে ১৬টি আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। সরকার গঠনের পর শরিকদের মধ্য থেকে দুজন নেতা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেও অধিকাংশ দল এখনও সরকার কিংবা বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাশিত প্রতিনিধিত্ব পায়নি। ফলে শরিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বৈঠকের বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক আমাদের সময়কে বলেন, ‘দুই-তিন দিন ধরে বৈঠকের কথা শুনছি। আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও আমন্ত্রণ পাইনি। বৈঠক হলে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরব। জোটগত ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করব।’
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সরকার রাজনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে- তাই বোঝার চেষ্টা করব; প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনব। যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত শরিক দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও সরকারের জার্নির সমাপ্তি ঘটবে, নাকি সরকারের পক্ষ থেকে শরিক দলগুলোকে বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেবে- তা জানতে চেষ্টা করব।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটভিত্তিক রাজনীতিতে সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও মতবিনিময় আস্থার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই বিবেচনায় ২০ জুলাইয়ের সম্ভাব্য বৈঠকটি শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বরং যুগপৎ আন্দোলনের অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তবে বৈঠকের ফলাফল এবং শরিকদের প্রত্যাশার কতটা প্রতিফলন ঘটে, সেটিই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জোট নেতা ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান, নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ আমাদের সময়কে বলেন, যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৈঠক করবেন। দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাবনা আছে বৈঠকটি ২০ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে পারে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দল বা আলোচ্যসূচি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।
জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে শুনেছি। তবে এখনও আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাইনি।’
জোট শরিক সূত্রে জানা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শরিক দলগুলোকে বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। এ নিয়ে শরিকদের সঙ্গে চলছে টানাপোড়েন। তাই মিত্রদের মান ভাঙাতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠক ও নৈশভোজের আয়োজন করেছেন।
শরিকদের একটি অংশ মনে করছে, আসন্ন বৈঠক শুধু সৌজন্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সরকার ও জোটের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, রাজনৈতিক সমন্বয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিকদের অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, সংসদ নির্বাচনে শরিক দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে যে অসন্তোষ রয়েছে, বৈঠকে তা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হতে পারে। পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়েও মতবিনিময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈঠকে শরিক দলগুলোর মতামত ও পরামর্শ শোনা হবে। এ ছাড়া দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা আমাদের সময়কে বলেন, যুগপৎ আন্দোলনে দীর্ঘ সময় এক সঙ্গে রাজপথে থাকলেও সরকার গঠনের পর তাদের অনেকের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তাদের আশা, এ বৈঠকে সরকার পরিচালনায় শরিকদের ভূমিকা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব এবং জোটের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হবে।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর দেখা যাচ্ছে- সিটি, জেলা পরিষদ প্রতিটি ক্ষেত্রে বিএনপির লোকজন; শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর কথা বিবেচনা করা হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় শরিকদের কয়েকটি আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু দলের বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়। অবশ্য লোকদেখানোর জন্য হলেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে; কিন্তু নেতাকর্মী-সমর্থকদের প্রতি কোনো নির্দেশনা ছিল না যে, জোট-শরিক প্রার্থীদের ভোট দিতে হবে। এখন হয়তো আসন্ন বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইস্যুতেও শরিকদের কাছে সমর্থন প্রত্যাশা করতে পারেন সরকারপ্রধান। বাস্তবতা হলো, রাজনীতির ভবিষ্যৎ এখন শরিকদের হাতে নেই- বরং ব্যক্তিস্বার্থে বিএনপিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। অনেকে বিএনপিতে যোগ দিতে মনস্থির করেছেন বলে খবর পাচ্ছি। অথচ আমরা চাই, শরিকদের প্রাপ্য মূল্যায়ন করা হোক।
