
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন পে-স্কেলে প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বছরে মূল বেতন বৃদ্ধি এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামো এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। যে কোনো সময় পে-স্কেল ঘোষণা হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার। সংশ্লিষ্ট সচিব কমিটির সব সদস্য ইতোমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। ফলে এখন সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে নতুন বেতনকাঠামো।
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি একসঙ্গে পুরোপুরি কার্যকর না করে দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানো হবে। পরের ধাপে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এতে একদিকে
সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন বৃদ্ধির দাবি পূরণ হবে, অন্যদিকে একসঙ্গে পুরো বেতন-ভাতা বাড়ানোর ফলে সরকারের ওপর যে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে, তা ধাপে ধাপে সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে কোন গ্রেডে মূল বেতন কত শতাংশ বাড়বে এবং দুই ধাপে ঠিক কোন কোন ভাতা কী হারে কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট হবে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর।
সুপারিশে ছিল ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ : নতুন বেতনকাঠামোর জন্য গঠিত নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সচিব কমিটি মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ কমিশনের প্রাথমিক প্রস্তাবের তুলনায় পরবর্তী পর্যায়ে বেতন বৃদ্ধির মাত্রায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে সুপারিশ দেওয়ার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, আইন সচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক রয়েছেন। এই কমিটি কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।
নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য ঘোষণা দেশের প্রায় ১৮ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন একই বেতনকাঠামোয় থাকার কারণে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কতটা তৈরি হবে এবং এর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর কতটা পড়বে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশের ফলে সরকার একদিকে কর্মচারীদের মূল বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবে, অন্যদিকে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা পরবর্তী বছরে কার্যকর করে ব্যয়ের চাপ কিছুটা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
