
ভারতের উত্তর প্রদেশের শামলিতে তথাকথিত ধর্মান্তরের নামে সাজানো এক ভুয়া মামলায় পুলিশি হেফাজতে বর্বর নির্যাতনের এক ভয়াবহ ও লোমহর্ষক চিত্র সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, সনাতন ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করা নওমুসলিম যুবক আয়ুশ মালিকের শ্বশুর ইসলাম কুরেশিকে পুলিশ হেফাজতে নির্মমভাবে পিটিয়ে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, শামলির দয়ানন্দ নগরের বাসিন্দা আয়ুশ মালিক কোনো প্রকার প্ররোচনা বা চাপ ছাড়াই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি চাঁদনি কুরেশি নামের এক মুসলিম তরুণীকে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক বিয়ে করে ঘর সংসার শুরু করেন। কিন্তু আয়ুশের এই ইসলাম গ্রহণ ও মুসলিম পরিবারে বিয়ে করার সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি তার পূর্বের পরিবার ও স্থানীয় কিছু উগ্রপন্থী সংগঠন। তারা বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে মোড় নিতে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও সাজানো একটি ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তর’ ও ‘সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত’ বলে থানায় মামলা দায়ের করে।
এই সাজানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার ভিত্তিতে উত্তর প্রদেশ পুলিশ অত্যন্ত তৎপরতার সাথে নওমুসলিম আয়ুশের শ্বশুর ইসলাম কুরেশি, স্ত্রী চাঁদনি কুরেশি এবং তৌফিক কুরেশি নামের অপর এক নিকট আত্মীয়কে গ্রেফতার করে। মামলায় আরও বেশ কয়েকজন নিরপরাধ মুসলিমকে আসামি করা হয়েছে, যারা বর্তমানে পুলিশের চরম হয়রানি ও গ্রেফতার এড়াতে দিল্লির দিকে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে, ইসলাম কুরেশিকে গ্রেপ্তারের পর থানা লক-আপে তার ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরতা চালানো হয় বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। গত ২৪ জুন গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে যখন আদালতে হাজির করা হয়, তখন তিনি বিজ্ঞ বিচারকের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং পুলিশি নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। তিনি আদালতকে জানান, পুলিশের পাশবিক মারধরে তার কানের পর্দা ফেটে গেছে এবং তিনি তীব্র যন্ত্রণায় ভুগছেন। তিনি নিজের শারীরিক অবস্থা এবং পুলিশের এই বর্বরতা প্রমাণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে মেডিকেল পরীক্ষার আবেদন জানান।
আদালতের নির্দেশের পর গত বুধবার ইসলাম কুরেশিকে পুলিশি পাহারায় মুজাফফরনগর কারাগার থেকে শামলি জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকদের একটি বিশেষজ্ঞ দল তার কানসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেন। পরীক্ষা শেষে মেডিকেল রিপোর্টটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে সিলগালা করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে রিপোর্টটির ফলাফলের ওপর সবার নজর রয়েছে, যা পুলিশের এই অমানবিক পাশবিকতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণ করবে বলে আইনজীবীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
এদিকে ভারতের একাধিক মানবাধিকার কর্মী এবং স্থানীয় সচেতন মহল এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, একটি সম্পূর্ণ বৈধ বিয়ে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে যোগী আদিত্যনাথের পুলিশ যেভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একজন বয়ষ্ক মানুষের ওপর লক-আপে পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে, তা সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। তারা অনতিবিলম্বে এই ভুয়া মামলা প্রত্যাহার এবং দায়ী সাম্প্রদায়িক পুলিশ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
