দুদকের জালে বিআরটিসি’র ডিজিএম গোলাম ফারুক

বাংলাদেশ

এবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালে আটকা পড়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বি আর টিসি)–এরও ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (এস্টেট–চলতি দায়িত্ব) মো: গোলাম ফারুক। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি।


গত ২৫ নভেম্বর দাখিল হওয়া একটি দাখিলকৃত আবেদনের প্রেক্ষিতে অভিযোগটি আমলে নেয় দুদক। অভিযোগ যাচাই-বাছাই কমিটি (যাবাক)-এর সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশন এ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। এ তথ্য জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো: আকতার হোসেন।

দুদক সূত্র জানায়, বিআরটিসিতে কর্মরত ডিজিএম (চলতি দায়িত্ব) মো: গোলাম ফারুক বিভিন্ন পদে কর্মরত থাকাবস্থায় কোটি কোটি টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেন। নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। বিভাগীয় তদন্তে তার বিরুদ্ধে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ এর প্রমাণ মিলেছে।


সূত্রমতে, ১৯৯৯ সালের জুন মাসে বিআরটিসিতে ইন্সট্রাক্টর পদে যোগ দিয়েছিলেন গোলাম ফারুক। তিনি এখন বিআরটিসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, এস্টেট (চলতি দায়িত্ব)। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী এক ডিপোর ইউনিট প্রধান হিসেবে রেকর্ড ২ কোটি ৩৩ লাখ ১১ হাজার ৭৫০ টাকা বিআরটিসির তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন। ওই সময় তিনি বগুড়া ডিপোর দায়িত্বে ছিলেন।

বিআরটিসি বাসের দৈনন্দিন অর্জিত রাজস্ব বিভিন্ন চালক, কন্ডাক্টর, ব্যক্তিদের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া রেখে আসেন। যা পরবর্তীতে বিআরটিসির অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি। তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এর বহুমাত্রিক অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিআরটিসির নিজস্ব চালকদের বাদ দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বহিরাগত পছন্দসই চালকদের দিয়ে গাড়ি পরিচালনা করছেন। পরে সেসব গাড়ি পরিচালনায় অর্জিত অর্থ তিনি বিআরটিসির অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন।


এমন সুনির্দিষ্ট একটি অভিযোগে দেখা যায়, ডিজিএম গোলাম ফারুক ১ কোটি ১২ লাখ ৬২ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বিআরটিসির নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় দুদক টিম ওই প্রতিবেদন সংগ্রহ করবে।

সূত্রটি আরো জানায়, ২০১৬-২০১৭ সালে গোলাম ফারুক ছিলেন মোহাম্মদপুর বাস ডিপোতে। এ সময় বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি ইস্যুতে বড় ধরনের অনিয়ম করেন। এতে বিআরটিসির ২৮ লাখ ৩৫ হাজার ৬00 টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। কিন্তু বিআরটিসির অপরাপর কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে মামলা থেকে কৌশলে দায়মুক্তি নেন।

এদিকে বিআরটিসির একটি সূত্র জানায়, বিভাগীয় মামলা থাকা সত্ত্বেও ডিজিএম গোলাম ফারুক পদোন্নতি বাগিয়েছেন আওয়ামী জমানার পরিবহন সেক্টরের মাফিয়া শাহজাহান খানের আশীর্বাদে।

ক্ষমতার পালাবদলের পরও শাজাহান খানের দাপটেই কাঁপছে সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি। সেই দাপটে গোলাম ফারুকও এখনো দাপুটে কর্মকর্তা। বিআরটিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকার গাবতলী ডিপোর ম্যানেজার থাকাকালীন গোলাম ফারুক বেতন-ভাতা বাবদ ৩৫ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫ টাকা পরিশোধ করেননি।


এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ে চাকরিবিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে একাধিকবার শোকজ নোটিশ পেয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে ৪ কোটি ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ এর অভিযোগ রয়েছে গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে। এখনও তিনি ট্রিপের হিসাব গোঁজা মিল দিয়ে, বাস সার্ভিসিং ও খুচরা যন্ত্রাংশ কেনার নামে প্রতি সপ্তাহে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ অব্যাহত রেখেছেন। সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে তিনি ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি কিনেছেন। গ্রামের বাড়িতে কিনেছেন বিঘা বিঘা সম্পত্তি। গ্রামের বাড়িতে একটি আলীশান বাড়িও আছে তার। তিনটি অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার ডিপিএস রয়েছে তার। যা দুদকের অনুসন্ধান টিমের নজরদারিতে আনা হবে।

বিআরটিসির ডিজিএম গোলাম ফারুকের বিষয়ে দুদকের গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো: আকতার হোসেন বলেন, সরকারি কর্মকর্তার দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থপাচার দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ। এ অপরাধে যে-ই দোষী হবেন, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বর্তমান কমিশন বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, আসামির প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা দলীয় পরিচয় মুখ্য বিষয় নয়। দুদকের বিবেচ্য তফসিলভুক্ত অপরাধ এবং অপরাধের ধরন। যিনি যেই হোন না কেন, তাকে আমরা আইনের আওতায় আনছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *