মওদুদ আহমেদ :

আজ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৬১তম জন্মদিন।
সাধারণ জন্মদিনের মতো কোনো আয়োজন, উৎসব কিংবা কেক কাটার দৃশ্য নেই কোথাও। দল থেকেও রয়েছে স্পষ্ট নির্দেশনা—উদযাপন নয়, বরং সংযমই হবে প্রধান বার্তা।
কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতার জন্মদিন যখন নীরবতার মধ্য দিয়ে পালিত হয়, তখন সেটাই কখনো কখনো তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সংগ্রাম এবং দায়িত্ববোধকে আরও উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ করে।
রাজনীতিতে জন্ম, সংগ্রামে বেড়ে ওঠা
১৯৬৫ সালে জন্ম নেওয়া তারেক রহমান একটি রাজনৈতিক পরিবারে বড় হয়েছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু দেখতে দেখতেই বেড়ে ওঠেন।
কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পথ কোনো সহজ বা সোজাসাপ্টা ছিল না।
মাত্র পনেরো বছর বয়সে পিতৃহারা হওয়া, সামরিক শাসন ও আন্দোলনের সময়মুখর পরিবেশ—এসবই তাঁকে কৈশোর থেকেই অন্যরকম অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গড়ে তোলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে কিছুদিন ব্যবসায়িক খাতে সাফল্য অর্জন করলেও দেশের রাজনীতির টান তাঁকে শেষ পর্যন্ত সক্রিয় করে তোলে।
বগুড়ার স্থানীয় রাজনীতি থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন।
নেপথ্যের কৌশলী থেকে প্রকাশ্য নেতা
৯০-এর দশক এবং ২০০১ সালের নির্বাচন—এই সময়টিতে তারেক রহমান মূলত নেপথ্যেই কাজ করেন।
বিএনপির নেতাকর্মীরা বলেন, দলের সাংগঠনিক কাজ, নির্বাচন–কৌশল, স্থানীয় পর্যায়ে তৎপরতা—এসব ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন।
২০০২ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর নেতৃত্ব আরও দৃশ্যমান হয়।
পরে দুইটি জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করেন।
গ্রেফতার, নির্যাতন ও নির্বাসন
২০০৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। দেড় দশক পরও তাঁর শারীরিক নির্যাতনের স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় বলে দলের নিকট সূত্র জানায়।
চিকিৎসার প্রয়োজনেই তিনি যুক্তরাজ্যে যান, এরপর থেকে সেখানেই রয়েছেন।
কিন্তু দূরত্ব তাঁর ভূমিকা কমায়নি; বরং কখনো কখনো তা আরও বিস্তৃত করেছে।
ডিজিটাল নেতৃত্ব: দূরেও থেকেও দলের কেন্দ্রবিন্দু
লন্ডনে অবস্থান করলেও তারেক রহমান বিএনপির দৈনন্দিন রাজনীতির অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী।
ভিডিও কনফারেন্স, ভার্চুয়াল মিটিং, অনলাইন ব্রিফিং—আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি দলের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেন,
“এখন বিএনপির সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তারেক রহমান ‘দূরের নেতা’ নন; তিনি ঠিক কেন্দ্রেই আছেন।”
২০১৮ সালে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। সংগঠন পুনর্গঠনে তাঁর কঠোর পদক্ষেপ, শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ত্রাণ–উদ্ধারে সক্রিয় নির্দেশনা ইত্যাদি দলের ভেতরে নতুন গতি যোগ করেছে।
একটি জন্মদিন, যা আলোচনার চেয়ে নীরবতার প্রতীক
প্রতি বছরই তাঁর জন্মদিন ঘিরে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে কিছুটা উৎসাহ দেখা গেলেও—তারেক রহমান বরাবরই অনুষ্ঠানের বিপক্ষে।
এবারও দলকে কঠোরভাবে জানিয়েছে—
কেক কাটার অনুষ্ঠান নয়, প্রচারণা নয়, ব্যানার বা পোস্টার নয়।
দলীয় নেতারা বলছেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি ব্যক্তিগত উদযাপনের চেয়ে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ রয়েছে। কেউ বলেন, তাঁর ক্যারিশমা; কেউ বলেন, তাঁর দৃঢ়তা; অন্যরা দেখেন দুর্দিনে দলের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা।
যাই হোক, দেশের রাজনীতির একটি বড় অংশ তাঁকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনা হিসেবে দেখে।
শেষ কথা
আজ তাঁর জন্মদিন—কিন্তু উদযাপনের ঝলক নেই কোথাও।
এই নীরবতা হয়তো তাঁর রাজনৈতিক পথচলারই একটি প্রতীক—
সংগ্রাম, দায়িত্ব এবং দূরত্ব—এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি নেতৃত্বের লম্বা পথ।
তারেক রহমানের ৬১তম বছর তাই শুধু বয়সের হিসাব নয়—
এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায়ের অব্যাহত যাত্রা।
