
২১ মাসেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ এবং গাজার প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষের নিয়মিত অনাহার পুরো অঞ্চলের মানুষকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। চলমান গণহত্যার ওপর সাহসের সঙ্গে রিপোর্ট করা সাংবাদিকরা নৃশংসতার ওপর আলোকপাত করার জন্য তাদের জীবন এবং পরিবারের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়েছেন। তবে পরিস্থিতি এমন পর্যয়ে পৌঁছেছে, তারা এখন নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছেন।
এ অবস্থায় বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক সম্প্রদায়, প্রেস স্বাধীনতা সংস্থা এবং প্রাসঙ্গিক আইনি সংস্থাগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে গাজার সমগ্র জনসংখ্যার জন্য হুমকিস্বরূপ জোরপূর্বক অনাহার বন্ধের জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক।
গত ১৯ জুলাই আল জাজিরার সাংবাদিকরা সোশ্যাল মিডিয়ায় হৃদয়বিদারক বার্তা পোস্ট করা শুরু করেন। এটি ইঙ্গিত দেয়, সাংবাদিকরা তাদের চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছেন।
গাজায় আল জাজিরা আরবি চ্যানেলের সংবাদদাতা আনাস আল-শরীফের একটি শক্তিশালী পোস্টে বলা হয়েছে, আমি ২১ মাস ধরে এক মুহূর্তের জন্যও কভারেজ করা বন্ধ করিনি। আজ আমি অবর্ণনীয় যন্ত্রণার সঙ্গে স্পষ্টভাবে বলছি – আমি ক্ষুধায় ডুবে যাচ্ছি, ক্লান্তিতে কাঁপছি এবং প্রতি মুহূর্তে আমরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলা প্রতিরোধের চেষ্টা করছি।…গাজা মারা যাচ্ছে এবং আমরাও এর সঙ্গে মারা যাচ্ছি।
এই সাহসী সাংবাদিকরা যখন গাজার ভয়াবহ বাস্তবতা নিয়ে লিখে চলেছেন, তখন গণমাধ্যমে প্রায়শই তাদের উপেক্ষা করা হয়। তাদের ‘নিজস্ব গল্পের সাক্ষী’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে কেবল ‘তথ্যদাতা’ হিসেবে পরিণত করা হয়।
আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের মহাপরিচালক মোস্তেফা সোয়াগ গাজার সাংবাদিকদের দুর্দশার কথা উল্লেখ করে বলেন, গাজার সাহসী সাংবাদিকদের কাছে আমাদের কর্তব্য হলো- তাদের কণ্ঠস্বর আরও জোরদার করা এবং ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর জোরপূর্বক অনাহার এবং লক্ষ্যবস্তু হত্যার কারণে তারা যে অসহনীয় দুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছেন, তার অবসান ঘটানো।
তিনি বলেন, সাংবাদিক সম্প্রদায় এবং বিশ্বের ওপর বিরাট দায়িত্ব রয়েছে; আমাদের কর্তব্য হলো এই মহৎ পেশায় আমাদের সহকর্মীদের সমর্থন করার জন্য আমাদের আওয়াজ তোলা এবং সকল উপায় কাজে লাগানো।
মোস্তেফা সোয়াগ আরও বলেন, যদি আমরা এখনই পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বো যেখানে আমাদের গল্প বলার মতো কেউ থাকবে না। আমাদের নিষ্ক্রিয়তা ইতিহাসে আমাদের সহকর্মী সাংবাদিকদের সুরক্ষায় এক বিরাট ব্যর্থতা এবং প্রতিটি সাংবাদিক যে নীতিগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করেন – তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী আল জাজিরার পাঁচ জন সাংবাদিক – সামের আবুদাকা, হামজা দাহদৌহ, ইসমাইল আল-ঘৌল, আহমেদ আল-লুহ ও হোসাম শাবাত এবং আল জাজিরার পরিবারের অনেক সদস্য ও অন্যান্য সাংবাদিককে হত্যা করেছে। তবুও এই সাহসী সাংবাদিকরা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হুমকি এবং চাপের কৌশলের কাছে নতি স্বীকার করতে অস্বীকার করেছেন।
এই ধরণের হুমকির কাছে নতি স্বীকার করলে গাজার বেসামরিক জনগণের ওপর চলমান গণহত্যা, জোরপূর্বক অনাহার এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের কভারেজ প্রায় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যেত।
আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক এই জোরপূর্বক অনাহারের অবসান ঘটাতে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে – যেসব পদক্ষেপ সত্যের ধারক সাংবাদিকদেরও রেহাই দেয় না।
