কূটনীতিতেও বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচনের তাগিদ

জাতীয় শিরোনাম

বাংলাদেশে দেশে দ্রুত নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্র। ইতোমধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বার বার একই কথা পূর্ণব্যক্ত করেছেন।

এমনকি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমেরিকা সফরকালেও বাইডেন সরকারও একই কথা বলেছেন। সর্বশেষ চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েডং বিএনপির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে যত দ্রুত সম্ভব একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। একইসঙ্গে তারা নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে জানিয়েছেন চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী। গতকাল মঙ্গলবার চীনে বিএনপি প্রতিনিধিদলের চলমান সফরের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ সময় সকাল ১১টায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসময় তিনি এই প্রত্যাশার কথা বলেন। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

এ আগে গত বছরের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন ও রাজনৈতিক সরকারকে দায়িত্ব দেয়ার ওপর জোর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনাগুলোতে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফেরার বিষয়ে আলোচনা হয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সফর করেন। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনসহ মার্কিন প্রতিনিধিরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। একই সাথে তারা বাংলাদেশে যতদ্রুত সম্ভব অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দেন। কূটনৈতিক সূত্র মতে, ট্রাম্প সরকার ক্ষমতায় আসার পর যতবারই কূটনৈতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের আলোচনা হয়েছে, ততবারই ওয়াশিংটন বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের উপর তাগিদ দিয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার ওই সফরের পর তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব মো. জসিম উদ্দিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি সফরকালে হোয়াইট হাউজ, পররাষ্ট্র দপ্তরের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠককালে তারাও দ্রুত নিসর্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকারের উপর জোর দেন।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, সে সময় নির্বাচন নিয়ে সরকারের চিন্তাভাবনা জানতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন মনে করে, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হলে সেটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য ভালো হবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মনে করে, বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি দেশ ও বিদেশে সমর্থন রয়েছে। কিন্তু যত বেশি দেরি হবে, এই সমর্থন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। ফলে দ্রুত সংস্কার নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা প্রকাশ করা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী।

এদিকে, গত রোববার গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনের সাক্ষাত করেন। সেখানেও যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, স্বাভাবিকভাবে আলোচনা হয়েছে নির্বাচন নিয়ে। নির্বাচনের বিষয় এবং বিএনপির প্রস্তুতিসহ আমাদের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে বলেছি। লন্ডনে তারেক রহমান সাহেবের সাথে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকটার প্রশংসা করা হয়েছে। সেই মিটিংয়ের গুরুত্ব তারা অনুধাবন করতে পারছে এবং ওই মিটিংয়ের ফলে যে একটা দেশের মধ্যে বড় ধরণের স্বস্তি এসেছে এবং নির্বাচনমুখী হয়েছে তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

এর আগে গত ১৭ জানুয়ারি এক খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয়ই যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন দেখতে চায়। এটি বাংলাদেশকে তার পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা করতে সাহায্য করতে পারে। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এরিক গারসেটি এ কথা বলেন। এরিক গারসেটি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক দক্ষিণ এশিয়া দেখতে চায় এবং আমরা সেই দৃষ্টিভঙ্গি একে ওপরের সঙ্গে শেয়ার করি।

গত বছরের ১০ নভেম্বর এক খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে অনির্বাচিত সরকার চায় না যুক্তরাষ্ট্র। এই খবরটিতে বলা হয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মূখপাত্র বেদান্ত পাটেল ওয়াশিংটনে একটি সংবাদ সম্মেলন এ কথা বলেন। সেখানে বাংলাদেশি একজন সাংবাদিক নির্বাচন সম্পর্কে প্রশ্ন করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে অনির্বাচিত সরকার চায় কিনা। এমন প্রশ্নের উত্তরে মি. পাটেল বলেন, এ ধরণের প্রশ্নের উত্তর আমি আগেও দিয়েছি। বাংলাদেশে সবাই দ্রুত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায় যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ কোনো দেশেই বিশেষ কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীকে সমর্থন করে না। ওই সংবাদ সম্মেলনে মি. পাটেল আরো বলেন, অবাধ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা। এটি বাংলাদেশের জনগণেরও প্রত্যাশা।

অন্যদিকে বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচন চেয়ে চলতি বছরের ২১ মে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার ৪১ সিনেটর। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্য ও ফেডারেল পর্যায়ের ৪১ জন সিনেটর ও এমপি একযোগে একটি চিঠি দেন। ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো ওই চিঠিতে তারা বাংলাদেশে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ, আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য এবং সময়সীমা নির্ধারিত নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানান। একই সঙ্গে তাঁরা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) বিলুপ্তি এবং জুলাই বিপ্লবে শহীদ ও আহতদের জন্য ন্যায়বিচারের আহ্বান জানিয়েছেন।

চিঠির শুরুতেই অস্ট্রেলীয় এমপি ও সিনেটররা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক সংকটের মুখোমুখি এবং সরকারে গণতান্ত্রিক বৈধতার অভাব রয়েছে। তাঁরা লিখেছেন, বাংলাদেশের জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকভাবে তত্ত্বাবধানযোগ্য নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। এই রোডম্যাপটি ২০২৫ সালের মধ্যেই কার্যকর করতে হবে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তারা বলেন, বাংলাদেশে বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচন যথেষ্ট বৈধতা পায়নি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও একাধিকবার এই নির্বাচনগুলোর স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও স্থিতিশীলতার জন্য অবিলম্বে নতুন নির্বাচনী পরিকল্পনা প্রয়োজন।

চিঠিতে সংসদ সদস্যরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব বা অস্পষ্টতা জনগণের মধ্যে অনাস্থা বাড়িয়ে তুলবে এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে ফেলবে। বাংলাদেশের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পুরো প্রক্রিয়াটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *