উপসাগরীয় দেশগুলো কি যুদ্ধে জড়াবে?

আন্তর্জাতিক

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেঁপে উঠেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশরেখা। কাচ- কংক্রিট ভাঙার শব্দের সঙ্গে ভেঙেছে বহুদিন ধরে লালিত স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চাইলেও এবার সরাসরি আগুনের মুখে দাঁড়িয়ে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। প্রশ্ন উঠেছে- তারা কি যুদ্ধে জড়াবে?

ইরানের পাল্টা হামলায় দুবাই, দোহা, মানামা, কুয়েত সিটি ও রিয়াদসহ বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণ ও ধোঁয়া দেখা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিহত হয়েছেন অন্তত তিনজন। কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। লক্ষ্যবস্তু ছিল মার্কিন ঘাঁটি ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, তবে আঘাত লেগেছে বেসামরিক অবকাঠামোতেও।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে তৈরি হয়েছে এক অস্বস্তিকর দ্বিধা। তারা কি পাল্টা আঘাত হানবে, নাকি সংযম দেখাবে? পাল্টা হামলা মানে ইসরাইলের পাশে দাঁড়ানোর অভিযোগে আঞ্চলিক ক্ষোভের মুখে পড়া। আবার নীরব থাকলে নিজেদের জনগণের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

আমাদের যুদ্ধ নয়
গাল্ফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)-এর দেশগুলো শুরু থেকেই সরাসরি সংঘাতে জড়াতে অনিচ্ছুক। কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল থানি সতর্ক করে বলেছেন, জিসিসি দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে টেনে নেয়ার চেষ্টা চলছে। এতে উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি হবে এবং বাইরের শক্তি হস্তক্ষেপের সুযোগ পাবে। দোহাভিত্তিক গণমাধ্যম গালফ টাইমস-এর সম্পাদক ফয়সাল আল-মুদাহকা বলেছেন, এটি মূলত ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। উপসাগরীয় দেশগুলো উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সংলাপ চায়, যুদ্ধ নয়।

যে যুদ্ধ থামাতে চেয়েছিল উপসাগর
সংঘাত শুরুর আগে ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করছিল। ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ না রাখার এবং তা কমানোর ব্যাপারে রাজি হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে বড় ধরনের হামলা চালায়। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। এর জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায়। তবে ক্ষয়ক্ষতির ভার বহন করছে স্বাগতিক দেশগুলোই।

অসম্ভব এক সমীকরণ
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এখন এক কঠিন সমীকরণ। সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে জনগণের কাছে দুর্বলতার বার্তা যাবে। অনেকের মতে, যদি জবাব দিতেই হয়, তাহলে তা হতে পারে জিসিসি’র যৌথ কাঠামোর আওতায়। ১৯৮৪ সালে গঠিত পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স (যা পরবর্তীতে ইউনিফায়েড মিলিটারি কমান্ডে রূপ নেয়) ব্যবহার করে ‘নিজেদের সিদ্ধান্তে’ পদক্ষেপ নেয়ার পথ খোলা থাকতে পারে। এতে তারা সরাসরি ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নেয়ার অভিযোগ এড়াতে পারবে।

দুঃস্বপ্নের চিত্র
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা অবকাঠামো ঘিরে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট, তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা হলে মরুভূমির এই দেশগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়বে। প্রচণ্ড গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও বিশুদ্ধ পানির ওপর নির্ভরশীল জনজীবন মুহূর্তেই সংকটে পড়তে পারে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহেও পড়বে প্রভাব। কাতার একাই বিশ্বের বড় অংশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করে। আর হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক তেলের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। এ অঞ্চলে অস্থিরতা মানেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম উর্ধ্বমুখী হওয়া।

স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিতে আঘাত
উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের দীর্ঘদিন ধরে ‘নিরাপদ বিনিয়োগ ও পর্যটন গন্তব্য’ হিসেবে তুলে ধরেছে। আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের রেখা সেই ইমেজে বড় ধাক্কা। তবে আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, জিসিসি অতীতেও নানা সংকট সামাল দিয়েছে। এবারও তারা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

নতুন বাস্তবতা
এ সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতদিন প্রক্সি যুদ্ধ ও পরোক্ষ সংঘাতের কথা শোনা গেলেও এবার দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র সরাসরি লড়াইয়ের রূপ। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে সাজাতে হতে পারে। সব মিলিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো সরাসরি যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাদের অগ্রাধিকার- নিজেদের ভূখণ্ড, জনগণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা। তবে আকাশে যখন ক্ষেপণাস্ত্রের আগুন জ্বলছে, তখন নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ কতদিন থাকবে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
(আল জাজিরার বিশ্লেষণের সংক্ষিপ্ত সার)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *