ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা

বাংলাদেশ

স্বৈরাচার হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাট-অর্থপাচারের মূলে ছিল ব্যাংক ও ব্যাংকবর্হিভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। হাসিনার সময়ে ব্যাংকিং খাতই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মত দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অর্থনীতির শ্বেতপত্র কমিটি।

রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া দেশের ব্যাংকিং খাতকে গভীর সংকটে ফেলেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা ভারতে পলায়ন করলে ড. ইউনূসের নের্তৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। ব্যাংকিংখাত নিয়ে ওই সরকারের সঠিক নীতির অভাবে আরও খাদের কিনারে পৌঁছে ব্যাংক ও ব্যাংকবর্হিভূত আর্থিকখাত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়েছে নতুন সরকার। দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল আর্থিকখাতকে ঢেলে সাজানোর প্রচেষ্টা করছে বর্তমান সরকার। কিন্তু আর্থিকখাতের আগের চক্রটি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিশৃঙ্খলা তৈরীতে। এই ধারাবাহিকতায় চক্রটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল ও পদত্যাগের দাবিতে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আড়ালে মূলতঃ জামায়াত এই আন্দোলন করছে। এদিকে ইসলামী ব্যাংক ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা হয়। দীর্ঘদিন জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১৭ সালে এস আলমের নিয়ন্ত্রণ আসে ব্যাংকটিতে। যদিও এস আলমও জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক ও অনুগত।

মো. খুরশিদ আলমের পদত্যাগের দাবিতে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করছে সচেতন গ্রাহক ফোরাম। গতকালও তারা ইসলামী ব্যাংকের সামনে আন্দোলন করেছে। এই ধারাবাহিকতায় এবার অর্থমন্ত্রী বরাবর লিখিত দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্দোলনকারীরা।

ফোরামের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র প্রফেসর নুর উন-নবী বলেন, আজ বুধবার বেলা ১১টায় মতিঝিলের দিলকুশায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি মিছিল নিয়ে সচিবালয় অভিমুখে যাত্রা করবেন তারা। এসময় তাদের লিখিত দাবিগুলো স্মারক আকারে অর্থ মন্ত্রী বরাবর জমা দেওয়া হবে।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে মতিঝিলের ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ ঘোষণা দেন তিনি।

প্রফেসর নুর উন-নবী বলেন, ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এশিয়া তথা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাংকে পরিণত হয়। এই ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসতো এবং ব্যাংকটি দেশের উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করতো। ২০১৭ সালে বিগত সরকারের মদতে গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ এস আলম নামক একটি গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে অনিয়মিতভাবে ঋণ নেওয়া এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসা হয়।

তিনি বলেন, ব্যাংকের এই দুঃসময়ে এমডি ওমর ফারুক খান দায়িত্ব নেন এবং অল্প সময়ে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করে ব্যাংকটিকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেন। গত ১ জুন রাতে ব্যাংকের এক অবৈধ ভার্চুয়াল সভায় তার পদত্যাগপত্র নেওয়া হয়েছে। জোরপূর্বক তাকে পদত্যাগ করানো হয়েছে। আমাদের দাবি হলো বর্তমান চেয়ারম্যান খুরশিদ আলমের নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করে একজন সৎ, যোগ্য এবং শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান নিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র নেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিল করে তাকে স্বপদে পুনর্বহাল করতে হবে।

ফোরামের আহ্বায়ক বলেন, এস আলম গ্রুপের হাতে থাকা ৮২ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে ব্যাংকের মূলধন সমন্বয় করতে হবে এবং তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণের টাকা আদায় করতে হবে। একইসঙ্গে ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টের ১৮ নম্বর ধারা বাতিল করতে হবে, যা ঋণখেলাপিদের পরিচালনা পরিষদে আসার সুযোগ করে দেয়। এ ছাড়া, ব্যাংক লুটপাট ও অর্থ পাচারের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করে স্পেশাল ট্রাইবুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি বলেন, গ্রাহক ফোরাম এই দাবি আদায়ে সারা দেশে ইসলামী ব্যাংকের শাখাগুলোতে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি স্বার্থে নয় বরং দেশের অর্থনীতি এবং ব্যাংক ব্যবস্থাকে বাঁচানোর লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলমান থাকবে।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী মতিঝিলের দিলকুশায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয়। এদিনের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে প্রথমবারের মতো পুরুষ আমানতকারীদের পাশাপাশি নারী আমানতকারীরাও অংশগ্রহণ করেন।

গত ১ জুন সকালে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন শুরু করে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। এ সময় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। এরপর থেকে টানা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে আসছে সচেতন গ্রাহক ফোরাম।

উল্লেখ্য, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। পরে সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। ওই আন্দোলনের মধ্যেই গত ১ জুন রাতে ব্যাংকের এক ভার্চুয়াল মিটিংয়ে এমডি মো. ওমর ফারুকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *