
খবর৫২ এক্সক্লুসিভ : সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসকে সরকার প্রধান হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এই অবস্থায় অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, ইউনুস সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকবে? এই প্রশ্নটি নতুন নয়। ১৮ বছর আগে ২০০৭ সালেও যখন ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের রাজনৈতিক দল গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তখনও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল। ২০০৭ সালের সেই ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বর্তমান পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

২০০৭ সালের পটভূমি:
২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারী সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে । সে সময়ে সেনাপ্রধান মঈনউ আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হওয়ার জন্য ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন । লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ডক্টর ইউনুস স্বল্প মেয়াদের জন্য এই সরকারের প্রধান হতে আগ্রহী ছিলেন না, কারণ সরকারের মূল এজেন্ডা ছিল নির্বাচন এবং দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে রাজি না হলেও ডক্টর ইউনুস সে সময় একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন । জরুরি অবস্থা জারির পর থেকেই তিনি রাজনীতিবিদদের কঠোর সমালোচনা করতে শুরু করেন এবং দুর্নীতির সাথে জড়িত রাজনীতিবিদদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন । সে সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার শুরু হয়েছিল এবং বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দুজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছিল ।

রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ ও ব্যর্থতা
২০০৭ সালের জানুয়ারী মাসের শেষেই ডক্টর ইউনুস ভারত সফর করেন এবং সেখানকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর সাথে দেখা করেন । দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন যে দেশের পরিস্থিতি বাধ্য করলে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেবেন । ভারত সফর থেকে ফিরে তিনি বাহরাইন সফর করেন ।
২০০৭ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারী তিনি দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি লেখেন, যেখানে তিনি নিজের রাজনীতি সম্পর্কে পরামর্শ ও সহযোগিতা কামনা করেন এবং নতুন রাজনীতি সৃষ্টির জন্য উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন । এই চিঠিতে তিনি জনগণকেই মতামত দিতে বলেন কিভাবে রাজনৈতিক দল গঠন করা যায় এবং যোগ্য প্রার্থী মনোনীত করা যায় । এরপর তিনি আবারও ভারত সফর করেন এবং কলকাতায় বসে রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন । তিনি বলেছিলেন যে দেশের প্রয়োজনে রাজনীতি করতে গিয়ে বিতর্কিত হওয়ার ঝুঁকি নিতে তিনি রাজি আছেন ।
ভারত থেকে ফিরে ডক্টর ইউনুস রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং ঘোষণা দেন যে তার দলের সম্ভাব্য নাম হবে ‘নাগরিক শক্তি’ । তিনি গ্রামে গ্রামে ডক্টর ইউনুস সমর্থক গোষ্ঠী গঠনের কথাও বলেছিলেন । ২০০৭ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারী দৈনিক প্রথম আলো খবর প্রকাশ করে যে দুবাই যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে ডক্টর ইউনুস আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নাগরিক শক্তি’ নামে রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন এবং গ্রাম, মহল্লা ও ওয়ার্ডে ২০ সদস্যের প্রাথমিক প্রস্তুতি টিম গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন । তার রাজনীতি হবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও ঐক্যের । দলটির নীতি ও আদর্শ হবে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সুশাসন, দুর্নীতি ও দলীয়করণ মুক্ত ।
তবে, তিন মাসের মধ্যেই ডক্টর ইউনুস রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন । ২০০৭ সালের ৩রা মে জাতির উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন যে যাদেরকে সঙ্গে পেলে দল গঠন করে জনগণের সামনে সবল ও উজ্জ্বল বিকল্প রাখা সম্ভব, তাদের তিনি পাচ্ছেন না এবং যারা রাজনৈতিক দলে আছেন তারা দল ছেড়ে আসবেন না । বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তিনি এই প্রচেষ্টা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন । রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তখন বলেছিলেন যে একদিকে তিনি সাড়া পাননি অন্যদিকে দুই নেত্রীকে মাইনাস করা যায়নি ।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ
এবার ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর যখন ডক্টর ইউনুসকে সরকার প্রধান হিসেবে আনা হয়েছে, তখন আবার প্রশ্ন উঠছে তিনি কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন । নুরুল কবিরের সাথে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে ডক্টর ইউনুস বলেছেন যে ২০২৫ সালের শেষে অথবা ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নির্বাচন হতে যাচ্ছে । তবে তিনি নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে নিশ্চিত নন, কারণ তিনি ডেডলাইন মিস করতে চান না ।
২০০৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ মনে করলে বোঝা যায় যে সে সময় জরুরি অবস্থার মধ্যে এবং প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রী গ্রেফতার থাকা অবস্থায় ডক্টর ইউনুস রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন । এবারও আগস্টে পথ পরিবর্তনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে যার নাম ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’। তারা সারাদেশে কমিটি গঠন করছে ।
ডক্টর ইউনুস ২০০৭ সালে স্বল্প মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হতে রাজি হননি । এবার যখন তাকে সরকার প্রধান হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে, তখন নিশ্চয়ই তিনি প্রশ্ন করেছেন যে এই মেয়াদ স্বল্প মেয়াদের হবে নাকি দীর্ঘ মেয়াদের। এই প্রেক্ষাপটে তার কতদিন ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি নির্ভর করবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির উপর। ২০০৭ সালের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে রাজনৈতিক দল গঠন বা সরকার প্রধান হিসেবে টিকে থাকা নির্ভর করে জনগণের সমর্থন ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকার উপর ।
এই পরিস্থিতিগুলো বিশ্লেষণ করে ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন তা অনুমান করা কঠিন, তবে ২০০৭ সালের প্রেক্ষাপট বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করবে।
