
বিগত এক বছরে বিশ্বজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে শান্তি, বেড়েছে সংঘাত। বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তার পরিস্থিতি মূল্যায়নে তৈরি ‘গ্লোবাল পিস ইনডেক্স’ (জিপিআই)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য। চলতি বছরে প্রকাশিত এই সূচকে দেখা গেছে, বিশ্বের ৯৯টি দেশে শান্তির পরিবেশ আগের চেয়ে অবনতি হয়েছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে একক কোনো বছরে সবচেয়ে বড় পতন।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস’ (আইইপি) মঙ্গলবার এই বার্ষিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালে এই সূচক চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৩ শতাংশ বা ১১৯টি দেশে শান্তির অবনতি ঘটেছে। বর্তমানে বিশ্বে সক্রিয় বা রাষ্ট্রভিত্তিক সংঘাতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১টিতে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ।
প্রযুক্তি ও যুদ্ধের নতুন রূপ
আইইপির প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ কিলেলিয়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ড্রোন হামলার ঘটনা প্রায় ১১,৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শুধু রাষ্ট্রগুলোই নয়, প্রায় ৫৬৫টি সশস্ত্র গোষ্ঠী ব্যবহার করছে। এআই ব্যবস্থার কারণে যেখানে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে আগে পুরো একদিন লাগত, এখন তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে মানুষের নিয়ন্ত্রণ কমে আসছে এবং বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঝুঁকি ও মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছাচ্ছে।
সবচেয়ে শান্ত ও অশান্ত দেশ
চলতি বছরও টানা ১৯ বারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের তকমা ধরে রেখেছে আইসল্যান্ড। তালিকায় এর পরেই রয়েছে নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া এবং আয়ারল্যান্ড।
অন্যদিকে, এবারই প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক শান্তি সূচকের একদম তলানিতে (সর্বশেষ স্থানে) অবস্থান করছে রাশিয়া। সবচেয়ে অশান্ত দেশের তালিকায় রাশিয়ার পরেই রয়েছে সুদান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইউক্রেন এবং ইসরায়েল। গাজা উপত্যকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে ইসরায়েল ১৬৩টি দেশের মধ্যে ১৫৯তম অবস্থানে নেমে এসেছে, যা দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে অশান্ত পাঁচটি দেশের একটিতে পরিণত করেছে। গাজায় ৮১ শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র এবং অন্যান্য অঞ্চল
আঞ্চলিকভাবে সবচেয়ে বড় পতন দেখেছে দক্ষিণ এশিয়া। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে নেপালে, যা ২৬ ধাপ নিচে নেমে গেছে। পাকিস্তান সূচকে ১৫২তম অবস্থানে পিছিয়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সহিংস বিক্ষোভের জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ইতিহাসের সর্বনিম্ন ১৩৪তম অবস্থানে নেমে গেছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সামরিক ব্যয়
সহিংসতার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বিশাল ধাক্কা লেগেছে। ২০২৫ সালে সংঘাত ও সহিংসতার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব ৩.২ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ২১.৮১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক জিডিপির ১০.৫ শতাংশের সমান। এছাড়া ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী সামরিক খরচ রেকর্ড ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে।
সুদানের গৃহযুদ্ধকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত এবং ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
