দেড় মাসে দুইশ’ ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে গায়েব টু লাইক, গোল্ড লাইন ও গোল্ড রাশ

ঢাকা : অনলাইনে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জ। এসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে স্বল্প সময়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এখন ধীরে ধীরে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন প্রতারণার মাধ্যমগুলো মানুষের সামনে আসতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে প্রায় দুইশ ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে টু লাইক, গোল্ড লাইন ও গোল্ড রাশ নামে তিনটি অ্যাপ গায়েব হয়েছে।

জানা গেছে, অনলাইনে ওয়েবসাইট খুলে মানুষকে সহজ আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে টু লাইক ও গোল্ড রাশ বিজ্ঞাপন দেয় শুধু ভিডিও শেয়ারিং করলে টাকা আয় করা যায়। এক্ষেত্রে একটি আইডি কিনতে হবে। বিজ্ঞাপন দেখে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ ২৮ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে আইডি কিনেন। বিজ্ঞাপন ক্লিক করে টাকা আয় হয়। দৈনিকের টাকা দৈনিক উত্তোলন করা যায়। চলতি বছরের ১৫ আগস্ট টু লাইক ও গোল্ড রাশ অফার দেয় অর্ধেক টাকায় আইডি কেনা যাবে। এমন অফারে হাজার হাজার মানুষ ১৬ আগস্টের আগেই আইডি কেনেন। কিন্তু ১৭ আগস্টে টু লাইক ও গোল্ড রাশে’র ওয়েবসাইটে ঢুকতে গিয়ে ওয়েবসাইট দুটি আর নেই। এরপর যে দুটি ইউটিউব চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেখে প্রতারিত হয়েছেন তার মালিকের বিরুদ্ধে যশোরের কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন ডেফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু হেনা মো. আহসান হাবিব।

এ বিষয়ে আবু হেনা মো. আহসান হাবিব গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মি. টিস বাংলা’ ও ‘ইনকাম বাংলা’ নামে দুটি ইউটিউব চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেখে টু লাইক ও গোল্ড রাশ-এ বিনিয়োগে উৎসাহ পান। এই ওয়েবসাইট দুটিতে বিনিয়োগ করে তার পরিচিত আরও অনেকেই প্রতারিত হয়েছেন। কিন্তু দেশে নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করায় কেউ প্রকাশ্যে এসে অভিযোগ করছেন না।

আহসান হাবিবের করা মামলার তদন্তে নেমে গত ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাভার থেকে ইউটিউব চ্যানেলের মালিক শোভন ইসলাম (২৪) এবং ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর থেকে প্রিন্স হোসেনকে (২১) গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। এরপরই তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। সিআইডি জানতে পারে, টু লাইক, গোল্ড লাইন, গোল্ড রাশ-এর মাধ্যমে মাত্র দেড় মাসেই আহসান হাবিবের মতো লাখ লাখ গ্রাহক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। দেড় মাসেই আড়াইশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকচক্র।

বিজ্ঞাপনের আয়ের সুযোগের প্রলোভনের শিকার লাখ লাখ মানুষ দেশে নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করায় সরকারি দপ্তর বা আদালতে অভিযোগ করতে পারছেন না।

দেশের কোনো আর্থিক প্লাটফর্মে লেনদেন না হওয়ায় এবং প্রতারণার জন্য খোলা অ্যাপসগুলো গায়েব হয়ে যাওয়ায় প্রতারকরা কোথা থেকে এই প্রতারণার জাল বুনেছে তাও বুঝতে পারছে না সিআইডি।

জানা গেছে, টু লাইক, গোল্ড রাশ বা গোল্ড লাইন অ্যাপস তিনটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ইনস্টল করে অ্যাকাউন্ট খুলতে বলে। এরপরেই শুরু মানুষ প্রতারণার ফাঁদে আস্তে আস্তে ঢুকতে শুরু করে। এখানে সর্বোচ্চ প্যাকেজ ৭৫ হাজার এবং সর্বনিম্ন প্যাকেজ ২০ হাজার টাকায় খুলতে হতো। লেনদেনের ক্ষেত্রে বিকাশ, নগদ, রকেট বা দেশের অন্যান্য ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার হয়নি। দেশে নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করা হয়।

এ বিষয়ে সিআইডির সাইবার ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার (সি-৪) এর অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, সাইবার জগতে যেকোনো আর্থিক বিনিয়োগ সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। যারা টু লাইক, গোল্ড লাইন, গোল্ড রাশ নামে অ্যাপসে টাকা বিনিয়োগ করেছে, তারা তলে তলে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা করেছে। আমরা জানতে পেরেছি এখানে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাত্র দেড় মাসে অন্তত আড়াইশ কোটি টাকা নিয়ে গায়েব হয়ে গেছে একটি চক্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন