বাংলাদেশ সরকার বলেছে, সীমান্তে মিয়ানমার সেনাদের সন্দেহজনক গতিবিধি বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বিবিসিকে বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সম্পর্কিত চুক্তি অনুযায়ী সৈন্য সমাবেশের কারণ বা উদ্দেশ্য জানানোর কথা থাকলেও মিয়ানমার বাংলাদেশকে তা জানায়নি।

এদিকে, মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বক্তব্য তারা তাদের সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অবহিত করেছেন। কিন্তু ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি।

গত রোববার ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে সীমান্তে মিয়ানমারের সেনাদের গতিবিধি বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি অন্তত তিনটি পয়েন্টে মিয়ানমার সৈন্য সমাবেশ করছে কয়েকদিন ধরে। এর তথ্য প্রমাণ বাংলাদেশের কাছে রয়েছে বলে ঢাকায় কর্মকর্তারা বলেছেন।

তারা জানিয়েছেন, সেজন্য ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিবাদ করেছে।

কিন্তু হঠাৎ সীমান্তে কেন সৈন্য সমাবেশ করা হয়েছে- বাংলাদেশের এই প্রশ্নে মিয়ানমার এখনো কোনো জবাব দেয়নি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, মিয়ানমার তাদের অভ্যন্তরীণ কোনো সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতবাদী গোষ্ঠীর জন্য সৈন্য সমাবেশ করলেও সীমান্তের কাছে হওয়ায় তা বাংলাদেশকে জানানো উচিত ছিল।

‘আমরা ভিজ্যুয়াল পেয়েছি কিছু এবং আমরা কিছু ছবিও পেয়েছি। সেটি হচ্ছে যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী সিভিলিয়ান বোট ব্যবহার করে বাংলাদেশের সীমান্তের কাছে তাদের বেশ কিছু জায়গায় সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ কোনো ইনসারজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রকে তা জানানোর একটা নিয়ম আছে। তো তারা আমাদেরকে না জানিয়ে এ কাজটি করেছে। আমরা একারণে সেটা তাদের এখানকার দূতাবাসকে জানিয়েছি।’

তিনি আরো বলেছেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করি, এ ধরণের সৈন্য সমাবেশ ঘটানোর আগে- কী উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, কখন করা হচ্ছে এবং কী পরিমাণ করা হচ্ছে- এ বিষয়গুলো যেন সবসময় আমাদের জানিয়ে রাখা হয়। তা না হলে এখানে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে, এখানে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।’

তিন বছর আগে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছে।

এই সংকট দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধানের চেষ্টার অংশ হিসাবে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ২০১৮ সালে মিয়ানমার সফরে গিয়ে সীমান্ত সম্পর্কে দু’টি চুক্তি করেছিলেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, আন্তর্জাতিক নিয়মের বাইরেও দুই দেশের এই চুক্তি অনুযায়ী সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করার বিষয়ে বাংলাদেশকে জানানো হয়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেটিও মিয়ানমারকে বলা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফরের সময় যে দু’টি চুক্তি আমরা স্বাক্ষর করেছিলোম, তার একটি হচ্ছে, এস্টাবলিশমেন্ট অব বর্ডার লিঁয়াজো অফিস। আরেকটা ছিল কোঅর্ডিনেটেড পেট্রোল বা যৌথ টহলের ব্যাপারে। আমরা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছি যে, এই দু’টো চুক্তির আলোকে আমরা কাজ করতে পারি। তাদের দেশে যে ডোমেস্টিক চ্যালেঞ্জগুলো আছে, আমরা সেটা বুঝি। সেখানে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়, সেটাও বুঝি। এ কারণেই আমরা তখন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমাদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাক্ষর হয়েছিল।’

তিনি আরো বলেছেন, ‘এই চুক্তি দু’টির আলোকে কিন্তু মিয়ানমার আমাদেরকে আগে থেকে জানিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে এবং আমাদেরও সহযোগিতা নিতে পারে। কিন্তু সেটা না করে এই ব্যবস্থা যেটা নিয়েছে, এটি গ্রহণযোগ্য নয় আমাদের কাছে। তা আমরা তাদেরকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছি।’

সীমান্তে সৈন্য সমাবেশের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিবাদের খবর মিয়ানমারের একটি সংবাদ মাধ্যম মিজিমা নিউজ প্রকাশ করেছে। তবে তারা খবরটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের একটি অনলাইনের খবরকে উদ্ধৃত করে।

দেশটির সরকারও ঘটনাটি সম্পর্কে কোনো বক্তব্য দেয়নি।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক বিভাগের মহাপরিচালক অউং কো বিবিসিকে এটুকুই বলেছেন যে, তারা বাংলাদেশের বক্তব্য পেয়েছেন।

‘সীমান্তের ঘটনার ব্যাপারে ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশ সরকার যে বক্তব্য দিয়েছে, সেই রিপোর্ট আমরা পেয়েছি। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তা কর্তৃপক্ষের উচ্চ পর্যায়ে পাঠিয়েছি। এই মুহূর্তে এর বাইরে কোনো মন্তব্য নেই।’

বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলেছেন, ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা যখন বাংলাদেশে এসেছে, তখনো মিয়ানমার সীমান্তের কাছে সৈন্য সমাবেশ করেছিল।

এছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের পর তাদের সামরিক হেলিকপ্টার সীমান্তে উড়েছিল, যা নিয়ে সে সময়ও বাংলাদেশ প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যখন মিয়ানমারের পক্ষ ত্যাগ করা দু’জন সেনা সদস্যের জবানবন্দি রেকর্ড করেছে, তখন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করা হচ্ছে। পুরো রোহিঙ্গা সংকট থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে নেয়ার চেষ্টা কিনা- সেই সন্দেহও করেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলছেন, ‘আমার ধারণা মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এটা সম্পূর্ণই ডোমেস্টিক কারণ হতে পারে। কিছুদিন আগে কিন্তু আমরা দেখেছি দুই জন মিয়ানমার সেনা আন্তর্জাতিক আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছে, তারা যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন করেছে, এটা তারা ওপরের মহলের নির্দেশে করেছে। তারা এখন দৃষ্টিটা ঘুরাতে চাচ্ছে কিনা-সেটাও কিন্তু আমাদের চিন্তা করতে হবে।’

এদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, মিয়ানমারের সাথে সীমান্তে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সব সময় যা থাকে এখনো তাই আছে।

তিনি আরো বলেছেন, মিয়ানমার ঘটনার ব্যাপারে বাংলাদেশকে বিস্তারিত জানাবে-এটা বাংলাদেশ আশা করছে।

সূত্র : বিবিসি