সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার মধ্যবর্তী কলমাকান্দার গুমাই নদীতে যাত্রীবাহী নৌকা ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ থাকার প্রায় ৪২ ঘণ্টা পর এক শিশুসহ দুই জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে ধর্মপাশা উপজেলার ফলদির হাওর থেকে রতন মিয়া (৩৫) ও মনিরা আক্তারের (৫) নামে দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় এখনো ১৫ থেকে ১৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানান স্থানীয় সংবাদকর্মীরা। এ ঘটনার উদ্ধার হওয়া দুই জন হলেন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর ইউনিয়নের ইনাতনগর গ্রামের আব্দুল হান্নান অরফে আবু মিয়ার ছেলে রতন মিয়া। মনিরা একই গ্রামের আব্দুল ওয়াহাবের মেয়ে। এ নিয়ে মার্মন্তিক ট্রলার ডুবির দুর্ঘটনায় ১২ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে।

জানা গেছে, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার মধ্যবর্তী গুমাই নদীতে ফিটনেসবিহীন ট্রলারে যাত্রী পরিবহন করার কারণে গুমাই নদীতে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা। প্রথমে যে ট্রলারটি যাত্রী পরিবহন করছিল সেই ট্রলারটি যাত্রী না নিয়ে বিয়ের ভাড়ায় চলে যায়। আর এ সুযোগে একটি ফিটনেসবিহীন ট্রলারের যাত্রী (নিহত ও আহতদের) নিয়ে ছেড়ে গিয়েছিল। এ কারণে গত বুধবার সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর থেকে ঠাকুরাকোনার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী ট্রলারের সাথে একটি বাল্কহেড নৌকার মুখোমুখী সংঘর্ষে ১০ জনের প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে।

শুক্রবার বিকেলে আরো দুই জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে ১২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে মধ্যনগর ইউনিয়নের ইনাতনগর গ্রামের ৭ জন, পাইকুরাটি ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের ২ জন ও ৩ জন নেত্রকোনার মেদনী গ্রামের বাসিন্দা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মধ্যগনগর বাজার ঘাট থেকে আশপাশের গ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলায় ট্রলার চলাচল করে। বুধবার সকাল সাড়ে ৭টায় মধ্যনগর বাজার ঘাট থেকে মধ্যনগর ইউনিয়নের কামাউড়া গ্রামের অলি উল্লাহ ও হালিম উদ্দিন নামের দুই ভাইয়ের মালিকানাধীন একটি ট্রলার যাত্রী নিয়ে ঠাকুরাকোনার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল।
তাদের এ ট্রলারটিসহ আরো একটি ট্রলার এই নৌ-পথে চলাচল করে।

বুধবার অলি উল্লাহ ও হালিম উদ্দিনের ট্রলারটি ১৮ হাজার টাকায় সুনামগঞ্জের জালামগঞ্জ উপজেলার মাতারগাও গ্রামে একটি বিয়েতে ভাড়ায় যায়। আর এ সুযোগ গ্রহণ করে কলামাকান্দা উপজেলার চেমটি গ্রামের ফরহাদ মিয়ার ট্রলার চালক তার ছোট ভাই সোহাগ মিয়া।

সোহাগ মিয়া হালিম উদ্দিনের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাদের (হালিম উদ্দিন) পরিবর্তে ঠাকুরাকোনায় যাত্রী নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুমতি নেয়। তবে ঘটনার পর থেকে চালক সোহাগ মিয়া পলাতক থাকায় তার বক্তব্য জানা যায়নি। ফরহাদ মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও রিসিভ হয়নি।

ইনাতনগর গ্রামের বাসিন্দা মাহবুবুল আলম মঞ্জু বলেন, ট্রলারটি ছিল একেবারেই আনফিট এ কারণে যাত্রী পরিবহন করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করি। যদি সিরিয়ালের ট্রলারটি অতি মুনাফার আশায় অন্যত্র ভাড়ায় না যেত তাহলে এ দুর্ঘটনা ঘটতো না।

মধ্যনগর ইউপি চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার বলেন, অদক্ষ চালক আর লোহার তৈরি নৌকার কারণে সহজেই ট্রলারটি ডুবে যায়। ট্রলারে নিরাপত্তামূলক কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রাণহানী ঘটেছে। প্রতিটি যাত্রীবাহী ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট রাখা বাধ্যতামূলক করা উচিত।

বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে উদ্ধার কার্যক্রমে থাকা কলমাকান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অমিত রায় বিকেল সাড়ে তিনটায় বলেন, ইনাতনগর গ্রামের যে দুজন নিখোঁজ রয়েছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে তাদের সন্ধ্যান পাওয়া যায়নি। তবে উদ্ধার কাজ চলমান রয়েছে।

এ ঘটনায় নিহত ইনাতনগর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল ওয়াহাব বাল্কহেড নৌকা ও যাত্রীবাহী ট্রলারের চালকসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার কলামাকান্দা থানায় একটি মামলা দায়েরের পর ওই দিনই বিকেলে বাল্কহেড নৌকার চালকসহ আটক ৫ জনকে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করে নেত্রকোনা আদালতে প্রেরণ করেছে কমলাকান্দা থানা পুলিশ। এদিকে যাত্রীবাহী ট্রলার চালক সোহাগ মিয়া ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে।

বাল্কহেড নৌকায় থাকা আটক ৫ জন হলেন, চালক সোহাগ মিয়া (৩৫), আবাদুল (২২), জাফর আলী (৩২), বাপন মিয়া (১৯) ও বাদল মিয়া (৪৫)। তারা সবাই কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার পাটুলি এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

কলমাকান্দা থানার ওসি মাজহারুল করিম বলেন, মামলা দায়েরের পর আটক ৫ জনকে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং ট্রলারে চালক পলাতক সোহাগ মিয়াকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) আবু তালেব বলেন, সিরিয়ালে থাকা ট্রলারটি ছেড়ে না যাওয়ার বিষয়টি জানি। তবে কেনো যায়নি সে ব্যাপারে খোঁজ নেয়ার জন্য মধ্যনগর থানার ওসিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নৌ দুর্ঘটনা তদন্তে নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রধান করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ নিহতদের প্রতি গভীর সহমর্মীতা প্রকাশ করে তাদের রুহের শান্তি ও মাগফেরাত কামনা করেন। তিনি বলেন, নৌযানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় মেরিন আইনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা চলমান রয়েছে। নৌযানে যাত্রীর আনুপাতিক হারে লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে যাত্রিদের চলাচলে সচেতন হওয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন।