আমেরিকার নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ছিনতাই করা যাত্রীবাহী বিমান দিয়ে যে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছিল – তার ১৯ বছর পুরো হলো।

যে আল-কায়েদা এই আক্রমণ চালিয়েছিল বলে দাবি করা হয় – তখন তারা ছিল আফগানিস্তানভিত্তিক জিহাদী গোষ্ঠী ।

কিন্তু এখন তারা কি অবস্থায় আছে?

আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন-লাদেন ২০১১ সালে পাকিস্তানের এ্যাবোটাবাদে মার্কিন বাহিনীর এক আক্রমণে নিহত হন।

তার পর সংগঠনটির নেতৃত্ব নেন আয়মান আল-জাওয়াহিরি।

অনেক মাস হয়ে গেল আল-জাওয়াহিরির কোনো খবর পাওয়া যায়নি, তার কোনো বার্তাও প্রচার হয়নি। যা একটু অস্বাভাবিক, এবং এই অনুপস্থিতির কারণে জল্পনা-কল্পনা চলছে যে, তিনি হয়তো মারা গেছেন বা শারীরিকভাবে অসমর্থ হয়ে পড়েছেন।

জুন মাসে সিরিয়ায় আল-কায়েদার শাখাটিকে চুপ করিয়ে দেয় একটি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী।

ইয়েমেনে আল-কায়েদার নেতা এক মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হবার কিছুদিন পরই সংগঠনটি সেখানকার স্থানীয় বিদ্রোহীদের হাতে পরাজয় বরণ করে।

এছাড়া জুন মাসে আল-কায়েদার আফ্রিকা শাখার নেতা মালিতে এক ফরাসী হামলায় নিহত হয়। সংগঠনটি এখনো তার কোনো উত্তরাধিকারীর নাম ঘোষণা করেনি।

তবে আফ্রিকায় সোমালিয়া এবং মালিতে আল-কায়েদা এখনো একটি শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে টিকে আছে।

বিভ্রান্তি : কোন পথে যাবে সংগঠনটি?
জিহাদী আন্দোলনের অন্য সংগঠনগুলোতেও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার ব্যাপারে একটা বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে।

আল-কায়েদার অবস্থা তার চেয়ে ভিন্ন নয়, সেখানেও এই একই দ্বিধা কাজ করছে।

দ্বিধাটা হচ্ছে : জিহাদী আন্দোলন কি সাধারণ মুসলিমদের মন জয় করার স্বার্থে নিজেকে আধুনিকায়ন করবে এবং নিজেকে টিকিয়ে রাখবে? নাকি, কট্টর জিহাদী নীতি-আদর্শকেই আঁকড়ে রেখে মুসলিমদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার ঝুঁকি নেবে?

প্রতিটি বিকল্পেরই কিছু ঝুঁকি আছে।

প্রথম পথ নিলে গোষ্ঠীটির অতীত কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে যে জিহাদী ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে তা বানচাল হয়ে যেতে পারে। এর ফলে সংগঠন ভেঙে যেতে পারে এবং কট্টরপন্থীরা দলত্যাগ করতে পারে।

আর দ্বিতীয় পথটি নিলে তাদের কর্মকাণ্ড চালানোর সক্ষমতা ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে যেতে পারে – তা এমন পর্যায়েও যেতে পারে যে সংগঠনটিরই মৃত্যু ঘটতে পারে।

সাম্প্রতিক কিছু সাংগঠনিক বিপর্যয়
সিরিয়ায় আল-কায়েদার প্রতিনিধি হচ্ছে তাদের অঘোষিত শাখা ‘হুররাস আল-দীন’ – এবং এ সংগঠনটি সেখানে শিকড় গাড়তে পারেনি।

এর দুটি কারণ। এক, জিহাদীদের নিজেদের ভেতরকার দ্বন্দ্ব। দুই, আল-কায়েদার কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন-নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনের কড়া নজরদারি।

সিরিয়ায় এই গোষ্ঠীটি জনপ্রিয়তা পায়নি। কারণ সিরিয়ানরা আল-কায়েদাকে একটা হুমকি হিসেবে দেখে, যাদের কোনো নড়াচড়া দেখলেই সরকারি বাহিনী বা আন্তর্জাতিক বাহিনী তাদের পেছনে লেগে যায়।

গত দু মাস ধরে সিরিয়ায় হুররাস আল-দীন নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে।

কারণ অধিকতর শক্তিশালী একটি জিহাদী গ্রুপ তাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে এবং এর কিছু শীর্ষ নেতা সম্প্রতি সন্দেহভাজন মার্কিন বিমান হামলার শিকার হয়েছে।

ইয়েমেন
ইয়েমেনে আল-কায়েদার শাখার নাম আল-কায়েদা ইন দি আরাবিয়নি পেনিনসুলা বা এ কিউএপি।

এক সময় এরা ছিল আল-কায়েদার শাখাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।

কিন্তু এই সংগঠনটি সম্প্রতি কিছু বড় আঘাতের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এখন এটি আল-কায়েদার সবচেয়ে কম সক্রিয় শাখাগুলোর একটি।

একিউএপির নেতা এ বছর জানুয়ারির শেষ দিকে এক মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হন। তাছাড়া কেন্দ্রীয় বাইদা প্রদেশে তাদের যে শক্ত ঘাঁটি ছিল – সম্প্রতি হাউছি বিদ্রোহীদের হাতে তার পতন ঘটেছে।

গত বেশ কয়েক বছরে আল-কায়েদার মধ্যে অনেক গুপ্তচর ঢুকে পড়েছে। ফলে এর নেতাদের ওপর নির্ভুল নিশানায় আক্রমণ চালানোর সুবিধা হয়ে গেছে।

তা ছাড়া সংগঠনটির মধ্যে দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি।

তবে একটি ঘটনায় এটা প্রমাণ হয়েছে যে একিউএপি এখনো পশ্চিমা দেশগুলোতে একক আক্রমণকারীর বা ‘লোন উল্ফ’ হামলার আয়োজন করতে ভুমিকা রাখছে – যে কারণে সংগঠনটিকে আগেও ভয়ের চোখে দেখা হতো।

গত ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার পেনসাকোলা নৌঘাঁটিতে একজন সৌদি সামরিক প্রশিক্ষণার্থী মোহাম্মদ আল-শামরানি গুলি চালিয়ে ১১ জনকে হতাহত করে, এবং পরে নিজেও নিরাপত্তা রক্ষীদের হাতে নিহত হয়।

এর পর ফেব্রয়ারি মাসে একিউএপি জানায় ওই আক্রমণের পেছনে তারাই ছিল, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

আল-কায়েদা ইন দি ইসলামিক মাগরেব
একিউ আইএম হচ্ছে আল-কায়েদার সবচেয়ে কম সক্রিয় শাখাগুলোর একটি।

তাদের আলজেরিয়ান নেতা এ বছর জুন মাসে মালিতে এক ফরাসী অভিযানে নিহত হয়। নতুন নেতার নাম এখনো ঘোষিত হয়নি এবং এর কারণও জানা যায়নি।

কিন্তু একটি সংগঠনের নেতার পদ শূন্য থাকাটা সেই গোষ্ঠীর ভালো অবস্থার ইঙ্গিত দেয় না।

আল-কায়েদার জন্য আলজেরিয়া এবং উত্তর আফ্রিকায় জায়গা তৈরি করে নেয়াটা কঠিন।

কারণ এই অঞ্চলে ১৯৯০ এর দশকে বহু বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল জিহাদীদের হাতে – যাদের মধ্যে ছিল অতি-উগ্রপন্থী সশস্ত্র ইসলামিক গ্রুপ জিআইএ।

মালি, বুরকিনা ফাসো এবং কখনো কখনো নাইজারে সক্রিয়া থাকতে দেখা যায় নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমীনকে (জেএন আই এম) – যাদের মূল ভিত্তি মালিতে এবং এরা সোমালিয়ার আল-শাবাবের পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সক্রিয় আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী।

তবে সম্প্রতি ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে এরা খানিকাটা গৌণ হয়ে গেছে।

আল-শাবাব
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বর্তমানে আল-কায়েদার সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী শাখা হচ্ছে আল-শাবাব।

সোমালিয়ার মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলীয় ভূখন্ডের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে তারা এবং সেখানকার গ্রামীণ এলাকায় তারা একধরণের প্রশাসন কায়েম করেছে।

তা ছাড়া সোমালিয়া ও পার্শ্ববর্তী কেনিয়ায় মাঝেমাঝেই আক্রমণ চালিয়ে থাকে তারা। এ বছর আল শাবাব কেনিয়ায় ম্যান্ডা বে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় । এতে তিনজন আমেরিকান নিহত ও অনেকগুলো বিমান ধ্বংস হয়।

এ ছাড়া আগস্ট মাসে মোগাদিসুর একটি হোটেলে চালানো তাদের এক হামলাতে ১২ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়।

২০১৯ সাল থেকে আল-কায়েদা জেরুসালেমের ওপর আলোকপাত করে একটি সামরিক ও প্রচারণামূলক অভিযান শুরু করে। এতে ‘ফিলিস্তিনের মুক্তি’-কে তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয় – আর মার্কিন যু্ক্তরাষ্ট্রকে তুলে ধরা হয় তাদের এক নম্বর শত্রু হিসেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বার্তা
আল-কায়েদার নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এ বছর দৃশ্যমান হয়েছিলেন মাত্র একবার, – মে মাসে একটি ভিডিওতে।

তার এক মাস আগে ইসলামিক স্টেট সমর্থকরা জল্পনা করছিল যে, আল-জাওয়াহিরি হয় মারা গেছেন, অথবা তার স্ট্রোক হয়েছে এবং তিনি শারীরিকভাবে অসমর্থ হয়ে পড়েছেন।

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মন্তব্য করতে ব্যর্থ হওয়া বা নতুন ভিডিও প্রকাশ না করার ফলেই এ জল্পনা ছড়িয়েছিল।

আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা গত কয়েক বছরে আফগানিস্তান-পাকিস্তান অঞ্চলে মারা গেছেন। তাদের কেউ কেউ সিরিয়ায় মার্কিন ড্রোন হামলাতেও নিহত হয়েছেন।

ফেব্রুয়ারি মাসে তালেবানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র যে শান্তি চুক্তি সই করেছে, তাতে নির্দিষ্টভাবে বলা আছে যে, তারা কোনো বৈশ্বিক জিহাদী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেবে না। ফলে আফগানিস্তানে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়াটা ভবিষ্যতে তালেবানের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি বিশ্বের স্বাস্থ্য সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ-বিরোধী বিক্ষোভের সময় মার্কিন সরকারবিরোধী বার্তা দিয়ে সমর্থন কুড়াতে চেষ্টা করেছে আল-কায়েদা।

এসব বার্তায় আল-কায়েদা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সরকারগুলো তাদের জনগষের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে, এবং আফ্রিকান-আমেরিকানদের প্রতি ‘বর্ণবাদী’ আচরণের অবসান ঘটাতে হলে সশস্ত্র সংগ্রামই হচ্ছে একমাত্র পথ।

তবে যে সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী আক্রমণের জন্য দায়ী, তাদের এই বার্তা আমেরিকান জনগণের মনে কতটা সাড়া জাগাবে – তা বলা কঠিন।

সূত্র : বিবিসি