ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা:

ধরে নেয়া যাক আমাদের বলা হলো একজন আপাদমস্তক প্রতারকের জীবন নিয়ে একটা গল্প লিখতে। সেই গল্পে আমাদের দেখাতে হবে একটা মানুষ অতি তুচ্ছ শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অতি সাধারণ অবস্থা থেকে সমাজের অতি উঁচু পর্যায়ে গেছে প্রতারণার মাধ্যমে। আমার ধারণা আমরা একেবারে সর্বোচ্চ কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে গল্প লিখলে সেটাও মো. শাহেদ-এর বাস্তব জীবনের তুলনায় অনেক অনুজ্জ্বল হতো। শাহেদ তার জীবনে যা যা করেছে আমাদের বহু মানুষের কল্পনাও সম্ভবত অত দূর যেত না।

আমরা কি কেউ ভাবতে পারতাম, যে লোক মানুষের শত শত কোটি টাকা মেরে দিয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমেও উপার্জন করেছে অবিশ্বাস্য পরিমাণ টাকা, সেই লোক ২৫ হাজার টাকা বেতনে হাসপাতালে সিকিউরিটি ইনচার্জের কাজ দেবার কথা বলে গ্রামের জমি বিক্রি করিয়ে চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে এক লাখ টাকা জামানত নেবে? এরপর কয়েক মাস গেলেও একটি টাকাও বেতন না দিয়ে উল্টো জামানতের টাকা চাইতে গেলে সেই ভদ্রলোককে রুমে আটকে পিটিয়ে চুরির অপরাধে পুলিশে সোপর্দ করবে? আমরা সম্ভবত কেউ কল্পনাও করতে পারতাম না যে একজন মানুষ কিছু ড্রাইভারকে ৮ হাজার টাকা দিয়ে বলবে রাস্তার পথচারীকে ধাক্কা দিয়ে আহত করে তার হাসপাতালে নিয়ে যেতে, যাতে সে তাদের আইসিইউতে নিয়ে লাখ লাখ টাকা বানাতে পারে।
একটা মানুষ সম্ভাব্য যত রকমভাবে প্রতারণা করতে পারে, তার সব রকমভাবে প্রতারণা করেছে শাহেদ। প্রতারণা করেছে বছরের পর বছর। সে পরিণত হয়েছিল প্রতারণার এক মহীরূহে। এই মহীরূহ হবার মতো অত্যন্ত উচ্চ ফলনশীল, পরিপুষ্ট বীজ ছিল শাহেদ, সন্দেহ নেই।

কিন্তু কে না জানে সবচেয়ে উচ্চ ফলনশীল, পরিপুষ্ট বীজটিও মহীরূহে পরিণত হওয়া দূরেই থাকুক, তার অঙ্কুরোদগমও হয় না, যদি সে অনুকূল পরিবেশ না পায়।

গত ১০ বছরে তার উত্থানের সময় ক্ষমতাসীন দল সম্পূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্রকে দিয়ে শাহেদের মতো প্রতারকের জন্য কেমন অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল সেটা মূলধারার মিডিয়ার অসংখ্য রিপোর্টে খুব ভালোভাবে প্রকাশিত। ক্ষমতাসীন দলটি ক্ষমতায় থাকার সময়েই ২০১১ সালে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং-এর নামে মানুষের ৫০০ কোটি টাকা মেরে দিয়ে কিছুদিন জেল খেটে ক্ষমতা আর অর্থ ব্যবহার করে বেরিয়ে আসতে পারা লোকটি বেরিয়ে আবার এই সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ২০১৬ সালে তার বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া রিপোর্ট অজ্ঞাত (পড়ুন জ্ঞাত) কারণে কার্যকর করা হয়নি। এমনকি রিজেন্ট কেলেংকারি ফাঁস হবার এক মাস আগেও তাদের প্রতারণা নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিপসম-এর লিখিত অভিযোগ আমলে নেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তালিকা অনেক বড় করা যায়, এই মুহূর্তে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ শাহেদের এসব তথ্য আমরা জানি, তাই এই আলোচনা আর বাড়াচ্ছি না।

আসা যাক আমার লেখার মূল বিষয়টিতে। গতকাল শাহেদকে নিয়ে প্রকাশিত দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার একটা অংশ উদ্ধৃত করছি- আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুস সাত্তার দুলাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘চেক প্রতারণার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি শাহেদ করিম। ২০০৮ সালে চেক জালিয়াতির অভিযোগে মজিবর রহমান নামের একজন ব্যবসায়ী শাহেদ করিমের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। সেই মামলায় বিচার শেষে ২০১০ সালের ১৮ই আগস্ট ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত শাহেদকে ৫৩ লাখ টাকা জরিমানা করেন। একইসঙ্গে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেন। আদালত থেকে শাহেদের বিরুদ্ধে তখনই সাজার পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু পুলিশ আজ পর্যন্ত শাহেদকে ধরেনি। ফলে বাদী তার টাকাও পাননি। ওই মামলায় শাহেদ পলাতক ছিলেন। পলাতক থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছিল।

সাজা দেয়া এবং তারপর পলাতক আসামির জন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা  আদালতের এখতিয়ার। সেটাকে পালন করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজ। এটা করতে তারা আইনগত এবং সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। কখনো কখনো এটা হতে পারে- একেবারেই অপরিচিত কোনো অপরাধী পালিয়ে বেড়াতে থাকলে তাহলে তাকে ধরা অনেক সময় পুলিশের পক্ষে কঠিন হতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তিটি সমাজে অত্যন্ত পরিচিত, যে ব্যক্তিটি সকাল-বিকাল গণভবন থেকে বঙ্গভবন ঘুরে বেড়ায়, যে ব্যক্তিটি আর সব প্রভাবশালীর সঙ্গে তো বটেই, পুলিশ প্রধান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবার সঙ্গে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে ছবি তুলে বেড়ায়, সেই মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া যায় না! তাই তার বিরুদ্ধে আদালতের জারিকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর হয় না!

এটা আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো আমলেই খুব শক্তিশালী ছিলনা। ক্ষমতাসীন সরকারগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। সেই চেষ্টায় তারা কম-বেশি সফলও হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই, বিশেষ করে ২০১৪ সাল থেকে জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া ক্ষমতায় থাকতে থাকতে এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একেবারে ভেঙে ফেলেছে। এটা কোনো নতুন চর্চা নয়, যুগে যুগে সারা পৃথিবীর ম্যান্ডেটহীন শাসকরা ঠিক এটাই করেছেন। প্রতিষ্ঠান যত দুর্বল হতে থাকে রাষ্ট্র তত দুর্বল হয়, আর তাতে সবকিছু ছাপিয়ে সর্বময় শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে একজন ব্যক্তি।
এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যে একেবারেই ভেঙে পড়েছে অতীতে নানা ঘটনায় আমরা দেখেছি। একজন শাহেদের বিরুদ্ধে দেয়া সাজা আর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর না হওয়া আমাদের সামনে এই সত্যটি আবার প্রকাশিত করেছে মাত্র।

এই দেশ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছে আর কয়েক মাস পরেই। এমন একটা সময়ে আমরা এটা করতে যাচ্ছি যখন এই প্রশ্ন আমাদের সামনে প্রধান হয়ে উঠছে- একেবারেই ভেঙেচুরে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে বাংলাদেশ কি আদৌ রাষ্ট্র হিসাবে টিকে থাকবে?