মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন পিতৃপুরুষ থমাস জেফারসন (১৭৪৩-১৮২৬) বলেন, ‘আমাকে যদি সংবাদপত্রবিহীন সরকার অথবা সরকারবিহীন সংবাদপত্রের মধ্যে একটিকে পছন্দ করতে বলা হয় তাহলে আমি মুহূর্তকাল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব না করে দ্বিতীয়টাই বেছে নেবো।’ তিনি সরকারের চেয়েও সংবাদপত্রকে অধিকতর কাম্য মনে করেন। স্বাধীনতার প্রবক্তা জেফারসন সরকারের অধীনতা প্রবণতার চেয়ে স্বাধীনতাকে প্রাধিকার দিয়েছেন। সন্দেহ নেই, সংবাদপত্র স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী। সে জন্যই হয়তো বিজ্ঞজন সংবাদপত্রকে ‘চতুর্থ রাষ্ট্র’ মনে করেন।

রাষ্ট্রের তিনটি অপরিহার্য অঙ্গ- আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মতো সংবাদপত্রও যেন আরেকটি অপরিহার্য অঙ্গ। যারা মানুষের স্বাধীনতায় বিশ^াস করেন, তারাই সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ^াস করেন। মুখ যেমন মনের আয়না, তেমনি সংবাদপত্রও সমাজের আয়না। তা দেখে বোঝা যায় মুখের অবয়ব। বলাই বাহুল্য, সেদিনের সংবাদপত্র ছিল প্রায় একক। এখন সংবাদপত্র বহুর মাঝে এক। তথ্যবিজ্ঞানের অসামান্য অগ্রগতি গণমাধ্যমকে দিয়েছে বিরাট ব্যাপ্তি। সে রাজত্ব করে দোর্দণ্ড প্রতাপে। মুঘল সম্রাটদের মতোই বিস্তৃত তার কর্তৃত্বের পরিধি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পাদপ্রান্তে তিনটি ‘প্রলয়ঙ্করী’ ঘটনা ঘটে- বার্লিন দেয়ালের ভাঙন (১৯৮৯), সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন (১৯৯১) এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব। হাতের মুঠোয় চলে আসে পৃথিবী। বাটন টিপলেই চলে যায় ওয়াশিংটন, লন্ডন কিংবা টোকিওতে। যেখানে ছিল সরকারের হরেক রকম আপত্তি, ঘটাতে পারত বিপত্তি, তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবে নিমিষেই উবে গেছে সব। হ্রাস পেয়েছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব। তবুও বসে নেই তারা। বাধার প্রাচীর গড়তে ব্যস্ত এরা। কিন্তু বাটন কি শোনে কারো কথা? সে যেন এক রাজনৈতিক ‘সুনামি’।

এখন গণমাধ্যমের হাজারো নাম। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, টিভি চ্যানেল, ইউটিউব, ফেসবুক, ম্যাসেজ, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, জুমÑ হাজারো চেহারা তার। টেলিভিশন, রেডিও, সিনেমা, ম্যাগাজিন, বইপত্র, অডিও সিডি, ডিভিডি সবই আজ গণমাধ্যম পদবাচ্য। গণমাধ্যমের বিভাজন দু’ভাগেÑ প্রকাশনায় (প্রিন্টিং) এবং বিদ্যুতায়নিক (ইলেকট্রনিক)। অপ্রতিহত ক্ষমতা তার। সংবাদ, তথ্য, আপ্যায়ন, বিলাস, বিনিয়োগ, ব্যবসায়-বাণিজ্য এবং বিজ্ঞাপন- সর্বত্রই তার অবাধ কর্তৃত্ব। পুরো বিজ্ঞান যেন সিন্দবাদের দৈত্যের মতো ভর করেছে তার মাথায়। তাই হয়তো একদিন যাযাবর লিখেছিলেন, ‘যুগটা বিজ্ঞানের আবার বিজ্ঞাপনেরও’। বিজ্ঞাপনের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে বিজ্ঞান। ‘সোনার হাতে সোনার কাকন কে কার অলঙ্কার’। পৃথিবীর তাবৎ কিছু রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি আজ গণমাধ্যমকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, বিবর্তিত ও পরিচালিত। গণমাধ্যমের মালিকানায় সম্পদ ও উৎপাদনের উপায় উপকরণগুলো নির্ধারিত ও বিতরণ হচ্ছে। রাষ্ট্র আর যেন নেই। বিশ^ায়ন হয়েছে রাষ্ট্রের। বিশ^ায়নের বেপারী সে। তবে বড় বড় ব্যাপারগুলো হাতে রাখতে ব্যস্ত রাষ্ট্রের সরকার।

গতানুগতিক পুঁজিবাদের বাহনগুলোÑ বহুজাতি করপোরেশন (এমএনসি) এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও (এনজিও) বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছে মাসমিডিয়া বা গণমাধ্যমকে। রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে, অঞ্চলে-অঞ্চলে অথবা আন্তর্জাতিক পরিসরে সংগঠিত হচ্ছে মিডিয়া মুঘলরা। রাষ্ট্র আর তাদের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শক্ত সা¤্রাজ্য। বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা অথবা জিটিভি-স্টার জলসা গড়ে তুলেছে তাদের নিজ নিজ সাম্রাজ্য। দেশের মানুষ একসময় দেশের সংবাদ না শুনে বিবিসি অথবা ভয়েস অব আমেরিকার মতো বিদেশের সংবাদমাধ্যমে নির্ভর করত। বিজ্ঞজনরা মনে করেন, বিবিসি আশির দশক থেকে সেই গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। মতাদর্শের বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছে তারা। আর ভয়েস অব আমেরিকা বা ভোয়া তো বলেই দেয়, ‘এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মতামত প্রতিফলিত’। রাষ্ট্রীয় পরিসরেও পুঁজির মালিক ও ভূমিদস্যুরা নিজ স্বার্থে বলীয়ান। তারা সবকিছু করতে পারে। তারা সবকিছু ভাঙতে পারে। তারা কাউকে ডোবায় অথবা ভাসায়। তাদের স্বার্থের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হলে ঘুরে দাঁড়ায়। নানা কারসাজিতে জনপ্রিয়তার বাহানা জানে তারা। হ্যাঁ উচ্চারিত হওয়ার আগেই তারা বলে, ‘হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে…’। তারা সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানাতে পারে। তারা সম্মতি অথবা অসম্মতি অথবা বিশেষ মত তৈরি করে।

বিজ্ঞজনরা একে বলছেন, ‘মেনুফ্যাকচার অব কনসেন্ট’। মার্কিন সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপম্যান (১৮৮৯-১৯৭৪) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, তারা কিভাবে ‘জনমত’ তৈরি করে। ক্ষমতা ও স্বার্থের সমীকরণে বিন্যস্ত হয় পাবলিক অপিনিয়ন বা জনমত। কখনো কখনো রাষ্ট্র সোল এজেন্ট হয়ে দাঁড়ায় জনমতের। গণমাধ্যমের স্তাবকরা বলার আগেই বুঝে যায় সবকিছু। ‘যেমনি নাচায় তেমনি নাচে, পুতুলের কী দোষ?’ ছোট্ট একটি উদাহরণ দেয়া যায়। জাপানের জনপ্রিয় দৈনিক আশাহি শিমবুনে খবর ছাপা হয়- ‘মরিনাগায় বিষ’। শেষ হয়ে যায় শিশুখাদ্য মরিনাগার বিশ^বাণিজ্য। আরেকটি ঘটনা, সম্ভবত ১৯৮০ সালে। ইরানি বিপ্লবের পরপরই এ ঘটনা। হজের সময় এএফপি খবর দেয়- মক্কা শরিফ অর্থাৎ খানায়ে কাবা আক্রান্ত। ইঙ্গিতটি ছিল ইরানের প্রতি। কিন্তু গণবিস্ফোরণে ভস্মীভূত হয় কয়েকটি দেশের মার্কিন দূতাবাস। বিধিবাম। বুমেরাং হয় ষড়যন্ত্র। এভাবে গণমাধ্যমের প্রাবল্যে ভেসে যায় পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ। তাদের প্রয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকার জারি করে নানা রঙের বিধি-নিষেধ। অনুগতরা শুধু তামিলই করে না, বরং প্রশংসা ও প্রশস্তিতে ভরে দেয় দেহমন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বন্দনার প্রতিযোগিতা চলে অনায়াসে। ন্যায় অথবা অন্যায়, নীতি অথবা দুর্নীতি, নিপীড়ন বা নির্যাতনÑ কিছুই তাড়িত-ব্যথিত করে না তাদের। ভক্তি-বিভক্তি, ভয়ভীতি, লোভ-লালসা ও পদ-পদবিতে আচ্ছন্ন থাকে তারা। বড়শির মতো টোপ গেলে এরা। মুলার গন্ধে টগবগিয়ে এগিয়ে চলে। এসব প্রতিযোগিতায় বিপন্ন হয় জনস্বার্থ। দীর্ঘায়িত হয় গণতন্ত্রের সংগ্রাম।

এভাবে মিথ্যা-সত্যের আবরণে গণমাধ্যমের যে ভূমিকা তা ‘ইয়োলো জার্নালিজম’ বা হলুদ সাংবাদিকতা বলে অভিহিত হয় দেশে দেশে। বিশেষ করে আমাদের মতো তৃতীয় দেশে। সাংবাদিক যেমন আছে, তেমন আছে মালিকপক্ষ। বাংলাদেশে দু’টি বড় করপোরেট হাউজের মালিকানাধীন দু’টি জনপ্রিয় পত্রিকায় স্বার্থের প্রতিযোগিতা লক্ষ করা গেছে। আর সরকার লালন করে রাষ্ট্রের মালিকানাধীন গণমাধ্যম। আলাদিনের চেরাগ অথবা দেও-দানবের শ্রী আংটি হাতে থাকে যাদের, রাষ্ট্রের গণমাধ্যম বশংবদ তাদের। এভাবে একসময় বিটিভির নাম হয়ে দাঁড়ায় ‘মিয়া-বিবির বাক্স’। মিয়া সাহেবের পতনের সময় ত্রিদলীয় ঐক্যজোট কথা দিয়েছিল, বিটিভি হবে স্বায়ত্তশাসিত। কেউ কথা রাখেনি। যদিও সরকার বদল হয়েছে এ হাতে অথবা ও হাতে। বিশেষ করে বিগত এক যুগ বিবেক বন্দী হয়ে আছে সেখানে। একটি দলের আমলে কিছুটা রাখঢাক ছিল। বোঝা যেত সরকার ও দলের কিছুটা পার্থক্য। এখন আর লজ্জাশরমের বালাই নেই। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় কিছু পত্রিকা ছিল। বাংলাদেশ হওয়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা অব্যাহত থাকে এবং অব্যাহতভাবে সরকারের স্বার্থে কাজ করে। দৈনিক বাংলা এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা বিশেষ করে বিচিত্রা তার অসামান্য জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক মতলব হাসিলের কাজে লাগায়।

ক্ষমতাসীন সরকার ওই মিনি মুঘলদের দৌরাত্ম্য দেখে কোটি কোটি টাকা লুটপাট থেকে রক্ষা করেছে রাষ্ট্রকে। কারণ কর্মরতরা ছিল তাদের রাজনৈতিক বৈরী। সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম একসময়ে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে, নিরপেক্ষতার সাথে, দায়িত্বের সাথে তাদের ভূমিকা পালন করেছে। হ্যাঁ, সেখানে রাজনীতি ছিল। অর্থনীতিও ছিল। তবে সাথে ছিল সংযম। তারা সীমালঙ্ঘনকারী ছিল না। এখন ‘ব্যবসায় সর্বস্বরূপ’ গ্রহণ করেছে গণমাধ্যম। একসময় ধারণা করা হতো পত্রপত্রিকা বা চ্যানেলগুলো মুক্ত জ্ঞানের চর্চা করবে। আর তা থেকে আলোকিত হবে মানুষ। এখন জ্ঞান-স্বার্থ বা জনস্বার্থ নয়, অর্থস্বার্থই সব। একসময় বিটিভির একক রাজত্ব ছিল। বিকল্প ছিল না। এখন বিকল্প অনেক। কিন্তু বিকল্পের কোনো ভূমিকা নেই। এক রঙ এক বেশ সর্বত্রই। প্রতিবাদী হয়নি কেউÑ এ কথা বলা মিথ্যা হবে। যারাই ভিন্নমত পোষণ করেছে, কৌশলে অথবা অপকৌশলে কুপোকাত হয়েছে তারা। দখল হয়েছে চ্যানেল। সরাসরি বন্ধ হয়েছে ওয়ান টিভি, দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি। আমার দেশ পত্রিকা একসময়ে গাত্রদাহ সৃষ্টি করেছিল। দুঃখের বিষয়, আইন তা বন্ধ করেনি। বেআইনিভাবে বন্ধ হয়ে গেছে তার লোকজ সংস্করণ। আর পোষ না মানার অপরাধে জেল-জুলুম, অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করেছে এর দায়িত্বশীল ব্যক্তি। এই সময়ে অলীক অভিযোগে অবরুদ্ধ আছেন একজন প্রবীণ সাংবাদিক। এখন পত্রিকা বা চ্যানেলের মালিকানা বা অনুমতি আইন দিয়ে নির্ধারিত না হয়ে সম্প্রদান কারকে পরিণত হয়েছে। অথচ এটা ছিল অধিকার। ভিন্নমত পোষণের শিকার হয়েছেন প্রবীণ প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসা। গুম হয়েছিলেন ফরহাদ মজহার এবং অবশেষে শফিকুল ইসলাম কাজল। করোনাভাইরাসের সময়েও অভিযুক্ত ও অন্তরীণ সাংবাদিকরা। সেই কবে খুন হয়েছিলেন সাগর-রুনি। তদন্তের জন্য হয়তো লাগবে অন্তকাল অথবা অনন্তকাল। একদিন বেরিয়ে আসবে সত্য। ততদিনে অস্বীকৃত বা অকার্যকর হবে বিচার। যেমনটি বলা হয়, ‘জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড’।

এতকিছুর পরও চ্যানেলগুলো জনগণের আস্থা-বিশ^াস দূরের কথা, বিনোদনের বাহনও হয়ে উঠতে পারছে না। পাশের দেশের চ্যানেলগুলো দেখে বেশির ভাগ মানুষ। অথচ বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো দেখা যায় না সেখানে। ওই সব চ্যানেলের বদৌলতে হিন্দি হয়ে উঠেছে তৃতীয় ভাষা। প্রভাবিত হচ্ছে নবপ্রজন্ম। বাঙালি সংস্কৃতির আদি ও অকৃত্রিম বুদ্ধিজীবীরা রা কাড়েন না এতে। এরা ‘জনচিত্তকে কলুষিত করছে, জনগণের চেতনাকে দুর্বল ও নি¤œগামী করছে’। যথার্থ বিনোদনের ব্যর্থতার পর এদের মান অবনতির কারণও জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে। সত্য ও যথার্থ জ্ঞান পরিবেশনেও তারা ব্যর্থ হচ্ছে। তারা ভুলে গেছে ‘জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানই পুণ্য’। বরং তারা বিশ^াস করে, বিজ্ঞাপনই শক্তি-বিজ্ঞাপনই যথার্থ।

ন্যায়-সত্য, সাহসিকতা ও মানবিকতার আবেদন হারিয়ে গেছে কবে। পাশ্চাত্য কথিত ও বুশ নির্দেশিত জঙ্গি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বক্তব্য এদের। দ্বিমত নেই আমাদের। অথচ দেশজ ঘুষ-দুর্নীতি, অন্যায়-অপকর্ম, হিংসা ও সহিংসতা এমনকি নারীর সম্মানহানির বিপজ্জনক ক্রমবর্ধমান প্রবণতাÑ তাদের দৃষ্টিগোচরে আসে খুব কমই। তথ্যপ্রযুক্তির তোড়ে বিলীয়মান সিনেমা হলকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র। কোনো ভদ্রজনের সিনেমা হলে প্রবেশ অস্বাভাবিক। চলচ্চিত্র অশ্লীল ও অশালীন। ৯৯ শতাংশ ছবি মারদাঙ্গা। নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতাই তার দীক্ষা। অথচ আমরা সোনার বাংলা গড়ার জন্য সোনার মানুষ চাই।

ধূলিধূসরিত পৃথিবীর দায় আমাদের নয়। ‘নিজের দু’টো চরণ ঢাকো তবে ধরণি আর ঢাকিতে নাহি হবে।’ আমাদের পা ঢাকতে হবে। এক টকশোতে জিজ্ঞাসা করেছিল, তাহলে প্রতিকার কিসে? বলেছিলাম, যাদের দিয়ে ভূত ছাড়াব, তাদের পেয়েছে ভূতে। সরিষায় ভূত থাকলে ভূত তাড়াবেন কিসে? সেখানে বার্লিন দেয়াল উঠেছে। দুই পরাশক্তির পরাক্রমে ধ্বস্ত-বিধ্বস্ত আমাদের গণমাধ্যমের পৃথিবী। সুতরাং প্রেস ক্লাবের দেয়ালের অবসান হতে হবে আগে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের সম্মান-মর্যাদা-নিরাপত্তা, পেশাগত দায়-দায়িত্ব- সবকিছুর জন্য প্রথম ও প্রধান শর্ত হচ্ছেÑ গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকদের সতত ঐক্য। উপস্থাপিত নিবন্ধে আমরা দেখেছি গণমাধ্যমের সর্বময় পৃথিবী। সে এক বিশাল হাতি। আমাদের শক্তিমানদের চোখ ছোট থাকার কারণে নিজেদের দেখতে পাচ্ছে না। আমাদের মতো সাধারণদের উচিত তাদের তাড়িয়ে কুয়োর কাছে নেয়া। যাতে তারা নিজেদের দেখতে পায়। তারা শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল ’৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে। সাংবাদিক ইউনিয়ন ছয় দিন বন্ধ রেখেছিল সব পত্রিকা। সিদ্ধান্ত ছিল, যত দিন স্বৈরাচারের পতন না ঘটবে, তত দিন বন্ধ থাকবে পত্রিকা। আমরা তাদের নিজ স্বার্থে জাগরণ চাই। বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটির উচিত সাংবাদিকদের অনুরূপ ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করা। আমাদের উপলব্ধি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী পেশাদার, নিরপেক্ষ ও ঐক্যপ্রয়াসী। এক-দুই বছর আগে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের একটি প্রয়াস নাগরিক সাধারণ গভীর আগ্রহের সাথে লক্ষ করেছে। কিছু স্বার্থ-সুবিধা ও পদ-পদবি ঐক্যের পথে ঐক্যের চেতনাকে বিনষ্ট করেছে। চরম ও পরম পথ ও ঐক্যের পথে বাধা। কিন্তু ঐক্যই হওয়া উচিত গণমাধ্যমের শেষ গন্তব্য। আর জাতীয় গন্তব্য গণতন্ত্র। বিজ্ঞজনরা মনে করেন, ‘দেশে রাজনীতির মান উন্নত করা গেলে এবং উন্নত চরিত্রের জনগণের সরকার: গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল’ প্রতিষ্ঠিত হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সম্মান প্রতিষ্ঠা হবে’।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Mal55ju@yahoo.com