গোলাম মাওলা রনি ::

যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবর্ষে ভর্তি হলাম, তখন আরো অনেকের মতো আমারও মনে হলো, দুই-একটা টিউশনি করা দরকার। অনেক চেষ্টা তদবিরের পর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় আমার এক স্কুলশিক্ষক একটা টিউশনি জোগাড় করে দিলেন। মধ্যবিত্ত পরিবার এবং দু’টো ছেলেমেয়ে। মেয়েটি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে এবং ছেলেটি পড়ে সপ্তম শ্রেণীতে। উভয়েই দেশের সবচেয়ে নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ত। ছেলেটিকে সম্ভবত ঘুষ দিয়ে ভর্তি করা হয়েছিল এবং মেয়েটিকে করা হয়েছিল একজন প্রভাবশালী লোকের তদবিরের মাধ্যমে। ফলে সংশ্লিষ্ট নামকরা ছেলেদের বিদ্যালয় এবং মেয়েদের বিদ্যালয়ে যে মানের ছাত্রছাত্রী অধ্যয়ন করত তাদের সাথে টিকে থাকার কোনো যোগ্যতাই আমার ছাত্রছাত্রীদের ছিল না। যেদিন প্রথম তাদের নিয়ে পড়তে বসলাম, সে দিনই তাদের ভীরু চোখ, অবদমিত মন এবং বিদ্যাবুদ্ধির বহর দেখে বুঝতে পারলাম, তাদের পিতা-মাতা সম্ভবত ভুল করেছেন।

আমার ছাত্রছাত্রীর বাবা উঠতি ধনী। গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে কেউ যদি ভালোভাবে লেখাপড়া এবং চরিত্র গঠন না করে হঠাৎ এক নম্বর-দুই নম্বর মিলিয়ে কিংবা চৌদ্দ নম্বর পন্থা অবলম্বন করে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদির মালিক বনে যান, তখন তার চরিত্রে যেসব মন্দ জিনিস ভর করে তার প্রায় সবই তার ছিল। তিনি শিক্ষাকে টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করতেন। তার ধারণা, একাধিক শিক্ষক দ্বারা পড়ালে এবং ছেলেমেয়েকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ালে যেকোনো কম মেধার ছেলেমেয়ে দ্বারা ভালো ফলাফল করিয়ে জজ-ব্যারিস্টার বানানো সম্ভব। তিনি ছেলেমেয়েকে অতিশয় আদর করতেন এবং পর্যাপ্ত খাবার খাওয়াতেন। ফলে তারা অতিমাত্রায় স্থূল হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে ছেলেটি ছিল দেখার মতো মোটাসোটা। প্রথম দিন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দরদভরা কণ্ঠে বললাম- বাবা তুমি এত মোটা হলে কী করে- তোমাকে দেখলে তো হাতির পাল ভয়ে পালিয়ে যাবে। আমার কথা শুনে সে কি বুঝল তা বলতে পারব না, তবে তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো- ভারি খুশি হয়েছে।

আমি আমার সাধ্যমতো পড়িয়ে ভালো ফলাফল করানোর জন্য উঠেপড়ে লাগলাম। সকালে ও রাতে দুই বেলা পড়াতাম। আরেকজন শিক্ষক পড়াতেন বিকেলে। গানের শিক্ষক আসতেন সপ্তাহে দু’দিন। ফলে আমার ছাত্রছাত্রীরা তাদের বিশাল স্থূল শরীর নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা, তিনবেলা প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়া, খাওয়া-ঘুম-বিশ্রাম ইত্যাদি করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠত। তারা প্রতিদিন তাদের পিতা-মাতা স্কুলের শিক্ষক এবং অন্য একজন প্রাইভেট শিক্ষক কর্তৃক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতো। ফলে আমি যখন তাদের আদর করতাম এবং স্নেহের সুরে কথা বলতাম কৃতজ্ঞতায় নির্বাক হয়ে তারা মায়াভরা ডাগর ডাগর আঁখি মেলে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। এক দিনের ঘটনা- রাতের বেলায় পড়াতে গিয়েছি। পড়ার রুমে ঢুকে লক্ষ করলাম, ছাত্রটি খুব মনোযোগ দিয়ে কি যেন দেখছে; মাঝে মধ্যে খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে এবং ক্ষণেক পরে গম্ভীর হয়ে কি যেন ভাবছে। আমাকে দেখে সে চমকে উঠল এবং কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা করল। আমি জিজ্ঞেস করতেই সে লজ্জায় ম্রিয়মাণ হয়ে বলল, স্যার বইতে একটি হাতি এবং একটি তিমির পাশাপাশি ছবি রয়েছে, এ কথা বুঝাতে যে তিমির তুলনায় হাতি কত ছোট। আমি ছবি দেখছিলাম এবং ভাবছিলাম আমি কী খাই, হাতি কী খায় এবং নীল তিমি কী খায়!’

এত বছর পর আমার সেই মোটাসোটা বালক বয়সী সহজ সরল ছাত্রটির কথা মনে এলো মূলত সাম্প্রতিককালের কিছু ঘটনা নিয়ে আমার ভীমরতিমূলক অবস্থার কারণে। প্রায়ই ‘কাউয়া’ নিয়ে চিন্তাভাবনা করি। রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় কোনো কাউয়ার ঝাঁক দেখলে আমি দাঁড়িয়ে যাই। পাখিগুলো কিভাবে খায়, কী খায়, কিভাবে মলত্যাগ করে- তাদের খাবারদাবার ও মলের মধ্যে রঙের পরিবর্তনটা কেমন ইত্যাদি নিয়ে ভাবি। কাউয়ার ডাকাডাকি, তাকানোর ভঙ্গি, হঠাৎ উড়ে যাওয়া বা কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ উড়ে এসে অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা শুরু করার কসরৎগুলো দেখে মাঝে মধ্যে ভাবি, আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?
একটি কাউয়ার সব কিছুই কালো। ঠোঁট-জিহ্বা-পালক-পা-নখ থেকে শুরু করে চোখ সবই কালো। পাখিগুলো সব ধরনের আবর্জনা, কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে পোলাও, কোর্মা, কালিয়া, কোপ্তা, আঙুর, কমলা, বেদানা ইত্যাদি সমানতালে মজা করে খেতে পারে। তারা ফকিরের মলত্যাগের স্থানে গিয়ে প্রাকৃতিক কর্মে রত ভিখিরিকে যে ভক্তি শ্রদ্ধা ও একাগ্রতা নিয়ে কা কা কা রবে গান শোনায়, একইভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় রাজা বাদশাহ যখন শাহী প্রাসাদের খাস কামরায় শুয়ে বসে কিছু একটা করার চেষ্টা করেন, তখনো কাউয়াগুলো একই স্বরে কা কা কা রবের সুরলহরী শুনাতে থাকে। এদের মলত্যাগের ভঙ্গিটিও অদ্ভুত। এরা সাধারণত মাটিতে বসে বা হাঁটা অবস্থায় মলত্যাগ করে না। কোনো উঁচু স্থানে উঠে সেটা কোনো সুউচ্চ ভবন বা বিশালাকায় বৃক্ষের মগডাল কিংবা অন্য কোনো সুবিধাজনক উঁচু স্তম্ভ- তারা সেখানে কখনো একাকী আবার কখনো দলবেঁধে বসে মহাআরামে এমনভাবে মলত্যাগ করে যাতে সেগুলো সোজা মাটিতে অথবা কারো শরীর বা মাথার ওপর পড়ে ‘রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া’ ঘটাতে পারে।

কাউয়া ছাড়াও আরেকটি পাখির প্রতিও ইদানীংকালে বেশ দুর্বলতা অনুভব করছি। সেটি হলো হাইব্রিড মুরগি। আমি জন্মের পর কোনো দিন ফার্মের মুরগি পছন্দ করতাম না। তারপর পত্রপত্রিকার মাধ্যমে যখন জানতে পারলাম যে, আমাদের দেশের হাইব্রিড মুরগিগুলো হলো ‘জীবন্ত বিষের কারখানা’ এগুলোকে বিভিন্ন ট্যানারির বর্জ্য অর্থাৎ কেমিক্যালযুক্ত পচা চামড়া দিয়ে তৈরি করা খাবার খাওয়ানো হয়। তাছাড়া ভেজাল ওষুধ খাইয়ে এগুলোকে মোটাতাজা করা হয়। ফলে এগুলোর ডিম, হাড্ডি, গোশত, কলিজা, গিলা সবই বিষাক্ত যা মানবদেহে ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এসব কারণে আমি হাইব্রিড মুরগিগুলোকে পদ্মগোখরা অথবা কালনাগিনীর মতো ভয় করতাম। কিন্তু ইদানীং আমার সেই ভয় কেটে গেছে এবং আমি অন্য সব মানুষের মতো সপরিবারে হাইব্রিড মুরগি দেদার গিলছি। এখন আমি বাজারে গেলে হাইব্রিড মুরগির দোকানে গিয়ে কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থাকি এবং হাজারো রকম আকাশ-কুসুম হাবিজাবি চিন্তা করতে করতে একগাদা মুরগি কিনে ঘরে ফিরি।

দু’টি প্রসঙ্গের অবতারণা করেছি। প্রথমটি হলো আমার ছাত্রটির কাহিনী এবং দ্বিতীয়টি কাউয়া ও হাইব্রিড মুরগি নিয়ে আমার আদিখ্যেতা। এখন এই দু’টি ঘটনার সাথে আজকের নিবন্ধের শিরোনামের কী সম্পর্ক এবং ২০২০ সালের জুলাই মাসে যখন করোনার তাণ্ডবে সারা দেশ থরথর করে কাঁপছে তখন কেন কাউয়া বা মুরগি নিয়ে নিবন্ধ লেখার জন্য আগ্রহী হয়ে পড়লাম সে কথা আপনাদের না বললে আমাকে ভুল বুঝতে পারেন। আপনারা হয়তো কম-বেশি সবাই জানেন যে, গত সাত-আট বছর ধরে আমাদের দেশের একশ্রেণীর মানুষ অন্য শ্রেণীর মানুষজনকে কাউয়া এবং হাইব্রিড মুরগি বলে গালি দিচ্ছেন। প্রথম দিকে গালিটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়; অর্থাৎ যারা গালি দিতেন তাদের লোকজন বাহবা দিত এবং মনে করত, বক্তা হয়তো কাউয়া বা হাইব্রিড চরিত্রের লোক নয়। অন্য দিকে যাদের উদ্দেশ করে গালি দেয়া হতো তারা বেশ অবদমিত হয়ে পড়তেন এবং লোকলজ্জার ভয়ে নিজেদের কিছুটা আড়াল করে চলাফেরা করতেন।

ছয়টি ঋতুর বাংলাদেশের সবকিছুর রূপ-রস-গন্ধ বদলাতে যেমন দেরি লাগে না, তেমনি হাইব্রিড মুরগি ও কাউয়া সম্পর্কিত গালির রসায়নে পরিবর্তন হতেও দেরি লাগেনি। যারা গালাগাল দিতেন তারা হঠাৎ লক্ষ্য করলেন যে, উল্টো লোকজন তাদেরই কাউয়া ও হাইব্রিড মুরগির বাবা-মা বলে গালি দিচ্ছে। অন্যদিকে, কথিত হাইব্রিড মুরগি ও কাউয়ারূপী মানুষেরা প্রকৃতির আদি ও আসল পাখি দুটোর মতো নিজেদের শরীর ও মন এমনভাবে গড়ে নেয় যে, সমাজের জন্য তারা ক্ষেত্রবিশেষে অপরিহার্য হয়ে পড়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেরা সব পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলে।

বাংলাদেশের মানুষরূপী কথিত কাউয়া ও হাইব্রিড মুরগিরা তাদের আদি বংশজাতদের মতোই সর্বভুক প্রাণী। তারা যেকোনো খাবার খেয়ে নির্বিবাদে হজম করতে পারে। তারা ডাস্টবিন থেকে যেমন নির্দ্বিধায় খাবার সংগ্রহ করতে পারঙ্গম তেমনি পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন খাবারগুলোতে হুটহাট উড়ে এসে ভাগ বসাতেও বেশ পটু। তারা পতিতালয় জুয়ার কোর্ট কিংবা অন্য কোনো রঙ্গমঞ্চে গিয়ে উলঙ্গপনার পরাকাষ্ঠা দেখতে যেরূপ দক্ষ, তদ্রƒপ মানুষের ভক্তিশ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ভালোবাসার স্থানগুলোতে হাজির হয়ে একদম প্রথম সারিতে বসে কোকিল-ময়না-টিয়া বা বুলবুলির কলকাকলী নকল করতেও মহা ওস্তাদ।

মানুষরূপী কাউয়া ও হাইব্রিড মুরগিরা সবকিছু অনায়াসে করতে পারে এ কারণে যে, তারা তাদের মানস পিতা-মাতাদের মতোই সর্বভুক এবং হারাম হালাল, মান অপমান, লাথি-গুঁতো, তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বিষয়ে অদ্ভুতভাবে নির্লিপ্ত এবং বেখবর থাকতে পারে। তারা প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে মানিয়ে যেভাবে নিজেদের বংশবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে তাতে আসল কাউয়া এবং হাইব্রিড মুরগিরা লজ্জার মধ্যে পড়ে গেছে। মানুষরূপী এসব কাউয়া ও হাইব্রিডদের রক্ত-মাংস হাড্ডিগুড্ডি এবং নাড়িভুঁড়ি তাদের অনবরত কুকর্ম, কুখাদ্য গ্রহণ এবং কুচিন্তার কারণে রীতিমতো সর্প বিষের মতো বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ এখন তাদের ভয় পায় এবং একটু সাহসী মানুষেরা তাদের সাথে তাল মিলিয়ে টিকে থাকার জন্য তাদের অভ্যাস আচরণ এবং শক্তিমত্তা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে তাদের সাথে খেলাধুলা করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে; যেমনটি সাপুড়েরা সাপ নিয়ে করে থাকে।

এবার আমার ছাত্রটির চিন্তা নিয়ে এবং আমার আদিখ্যেতা সম্পর্কে দুই-চারটি কথা বলে নিবন্ধের ইতি টানব। অল্প বয়সী ছাত্রটিকে আমি নেহায়েত মজা করার জন্য হাতির প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলাম, তাকে দেখলে হাতির পাল ভয়ে পালিয়ে যাবে।’ এই কথাটি সে তার মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে ছিল এবং নিজের সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করেছিল। পরে নিজের শরীর ঠিক রাখার জন্য খাবারের অভ্যাসে পরিবর্তন এনেছিল। একটি বালক যেভাবে আত্ম উন্নয়নের জন্য অত অল্প বয়সে মজাদার খাবার ও আরামদায়ক ঘুম ও অলসতা পরিহার করেছিলÑ সেভাবে আমাদের সমাজের লোকজন যদি কাউয়া বা মুরগি হিসেবে গালাগাল খাওয়ার পর একটু হলেও নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করত, তাহলে আমাকে হয়তো তাদের ব্যাপারে আদিখ্যেতা দেখাতে হতো না।

করোনা সঙ্কটের ধাক্কায় আমাদের দেশের জনগণ যেমন বুঝে গেছে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সহায় নেই, তেমনি আমিও বুঝে গেছি যে, কাউয়া ও হাইব্রিড মুরগির বিষ থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে ওদের সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে হবে। তাছাড়া এদের বিষ যদি কোনোক্রমে আমার শরীর ও মন-মস্তিষ্কে ঢুকে যায় সে ক্ষেত্রে যাতে সেই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত না হই এ জন্য অ্যান্টিবডি তৈরির জন্য মাঝে মধ্যে হাইব্রিড মুরগির গোশত খাওয়ার অভ্যাস জরুরি! মানুষরূপী কাউয়া ও হাইব্রিড মুরগিদের অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিহত, হজম এবং সম্ভব হলে ওদের নির্মূল করতে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য আমার মতো কেউ যদি আদিখেত্যা আরম্ভ করেন ওদের প্রজননে বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি হবে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য