খবর ৫২ ডেস্ক::

দেশের ৬ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলাগুলো হল: গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, পাবনা, জামালপুর, বগুড়া ও টাঙ্গাইল। তবে সার্বিকভাবে দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরও অবনতি হতে পারে।

 

 

লালমনিরহাট, নীলফামারী, সিলেট, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে কিছুটা উন্নতি হলেও বন্যাকবলিতই থাকছে। আর নতুন করে রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে শুরু হবে বন্যা। ঢাকার আশপাশের নদীর পানি সমতলে বাড়বে। তবে বিপদসীমা পার করার আশঙ্কা নেই। সোমবার সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) এ পূর্বাভাস দিয়েছে। ৭ জুলাই পর্যন্ত এ বন্যা চলতে পারে।

 

 

ভারতের পূর্বাঞ্চল থেকে নেমে আসা বানের পানি, অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এ বন্যা দেখা দিয়েছে। এ কারণে নয়টি নদী বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হল : ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা, ধরলা, ঘাঘট, সুরমা, কুশিয়ারা, পুরাতন সুরমা ও সোমেশ্বরী। বন্যাকবলিত এলাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

 

 

 

সোমবারও নতুন করে আরও চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তীব্র হয়েছে নদীভাঙন। আড়াই শতাধিক বাড়িঘরসহ অন্যান্য স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর বাম তীর রক্ষায় প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টি-বাঁধটি ভাঙনের মুখে পড়েছে। বন্যার্তরা রাস্তা, বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি বৃষ্টির কারণে তাদের ভোগান্তি বাড়ছে। ত্রাণের জন্য হাহাকার করছে মানুষ।

 

 

এফএফডব্লিউসি বলছে, মেঘনার উপরের অংশ বা ভৈরব বাজার থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত অংশে পানির সমতল তেমন একটা বাড়ছে না। এ ছাড়া দেশের প্রধান সব নদীর পানির সমতল বাড়ছে। এ প্রবণতা আরও তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা বিপদসীমা পার হতে পারে। যমুনা আরিচা পয়েন্টে ও মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকুলেও পদ্মা বিপদসীমা পার করতে পারে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। এতে রাজবাড়ী ও মুন্সীগঞ্জও যুক্ত হবে বন্যাকবলিত জেলার তালিকায়।

 

 

 

এদিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়, আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংয়ে বৃষ্টির প্রবণতা কমেছে। এ কারণে হ্রাস পাচ্ছে উজানের পানিপ্রবাহ। দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলেও বৃষ্টিপাত কমেছে। ফলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা ও ধরলার পানি হ্রাস পেতে পারে। তবে ধরলা বিপদসীমার উপরেই প্রবাহিত হতে পারে।

 

 

 

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকেদর বলেন, জুন মাসে এ ধরনের বন্যার ঘটনা নজিরবিহীন। সাধারণত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে বৃষ্টি হয়ে থাকে। কিন্তু এবার মে মাসে দুটি ঘূর্ণিঝড় উপমহাদেশে আঘাত হানে। তা থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। আবহাওয়ার এ ধরনের পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল বলে মনে করেন তিনি। পানি উন্নয়ন বোর্ড দেশের ১০১ স্থানে পানি সমতল পর্যবেক্ষণ করে থাকে। এর মধ্যে ১৪ স্থানে পানি বইছে বিপদসীমার উপরে। ৭২ স্থানেই বেড়েছে পানির সমতল।

 

কুড়িগ্রাম, উলিপুর ও রৌমারী : কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সোমবার সকালে ধরলার পানি বিপদসীমার ৭৬ ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ ছাড়া দুধকুমার নদীর পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত। পানিবন্দি প্রায় দেড় লাখ মানুষ পড়েছে চরম দুর্ভোগে। ৫ দিন বন্যার পানিতে ভাসলেও এখন পর্যন্ত কারও কাছে ত্রাণ পৌঁছেনি। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম পানিপ্রবাহের তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, তিস্তার ভাঙনে উলিপুরের নাগরাকুড়া টি-বাঁধের ব্লক পিচিংসহ ৫০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

 

 

ভাঙন দেখা দিয়েছে সারডোব, নুনখাওয়া ও মোঘলবাসা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ ১৫টি স্পটে। পানির চাপে বাঁধ ভেঙে রৌমারী উপজেলা শহর প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ৬শ’ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি হুহু করে বাড়তে থাকায় এ দুটি নদ-নদীর অববাহিকার ৫০টি চরগ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। সাড়ে তিনশ’ চর ও নদী সংলগ্ন প্রায় সাড়ে তিনশ’ গ্রামের দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

 

 

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, বন্যা ও ভাঙনকবলিত ৯ উপজেলায় ৩০২ টন চাল ও ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। খুব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে। রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার ৩০০টি গ্রামের মধ্যে প্রায় ৬৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্লাবিত হয়েছে ৫ শতাধিক হেক্টর জমির ফসল।

 

 

 

গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সোমবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে ১৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৮০ সেমি. ও ঘাঘট নদীর পানি নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫৪ সেমি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। অপরদিকে করতোয়ার পানি দ্রুত বাড়ছে।

 

 

২৪ ঘণ্টায় করতোয়ার পানি ৪৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেলেও এ নদীর পানি এখনও বিপদসীমার নিচে রয়েছে। এতে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়ছে হাজার হাজার মানুষ। এ ছাড়া পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গাইবান্ধা শহর সংলগ্ন খোলাহাটী ইউনিয়নে ঘাঘট নদীর অব্যাহত ভাঙনে শহর রক্ষা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পশ্চিম কোমরনই এলাকায় প্রায় ১ হাজার মিটার বাঁধে ধস দেখা দিয়েছে।

 

 

বগুড়া : বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সোমবার বিভিন্ন ইউনিয়নের চরাঞ্চলে নিচু এলাকা নতুন করে তলিয়ে গেছে। বিকালে নদীতে পানি বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল মিয়া বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা বন্যাদুর্গতদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। সোমবার বিকাল ৩টায় সারিয়াকান্দির মথুরাপাড়া পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

 

 

 

দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর ও সরিষাবাড়ী (জামালপুর) : দেওয়ানগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। পৌর এলাকাসহ ৮টি ইউনিয়নে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সোমবার দুপুরে দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টের যমুনার পানি ২৪ ঘণ্টায় ২৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা রাজিয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এনামুল হাসান বলেন, বানভাসিদের জন্য ১৯ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

 

 

সরিষাবাড়ীতে চরাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এতে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ৫টি ইউনিয়নের চরাঞ্চলের অন্তত অর্ধশত গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। যমুনার পানি সোমবার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপদ সীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

 

 

 

শিবচর (মাদারীপুর) : পদ্মা নদীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়ে মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চলে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভয়াবহ ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে একাধিক স্কুল ভবন, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, কমিউনিটি ক্লিনিক, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। নদীভাঙন প্রতিরোধে স্থানীয় সংসদ সদস্য চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর নির্দেশে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

 

 

 

ঈশ্বরদী (পাবনা) : পদ্মা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুণ্ডা ও সাঁড়া ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী কয়েকটি গ্রামের নিচু এলাকায় পানি উঠেছে। তীরে অনেক জায়গায় ছোটখাটো ভাঙনও দেখা দিয়েছে।

 

 

 

ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) : যমুনার পানি অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। এতে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গৃহহারা হয়েছে শত শত পরিবার। গাবসারা ইউনিয়নে প্রায় ৩১০টি বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অর্জুনা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ২৫০টি বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

 

 

 

সিলেট : সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সুরমা নদীর পানি কমলেও বেড়েছে কুশিয়ারায়। সোমবার দুপুরে সুরমা নদীর পানি একটি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে থাকলেও অপর পয়েন্টে বিপদসীমার নিচে নেমে এসেছে। কুশিয়ারায় পানি বাড়লেও কমেছে অন্য নদ-নদীর পানি। আগামী ১০ দিন সিলেটে মৌসুমি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। ফলে বন্যার আশঙ্কা এখনও কাটেনি।

 

 

 

সুনামগঞ্জ : সুরমা নদীতে পানি কমতে শুরু করেছে। নদীতে পানি কমলেও পানির চাপ বাড়ছে জেলার হাওর জনপদে। পাহাড়ি ঢল উজান থেকে ভাটির দিকে নেমে প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা। রাতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়ায় ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর বিপদসীমা ৭০ সেমি. থেকে নেমে সোমবার দুপুর পর্যন্ত ৩২ সেমি. এসে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টিপাত কম হলে সুরমা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোয় বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। জেলায় এ পর্যন্ত ১২৭টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১১৯৪টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ বলেন, ত্রাণ ছাড়াও দুর্গত মানুষকে সহায়তার জন্য ৪১০ টন চাল, ২৯ লাখ ৭০ হাজার নগদ টাকা ও ৫ হাজার পরিবারের জন্য শিশুখাদ্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

 

 

 

 

নেত্রকোনা ও বারহাট্টা : নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও বারহাট্টায় ১২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দুই উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অন্তত ১৭০০ বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। এতে এসব পরিবারের লোকজন দুর্ভোগে পড়েছেন। জেলার প্রধান পাঁচটি নদীর মধ্যে সোমেশ্বরীর একটি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি বইছে।