সুনামগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নতুন নতুুন এলাকা বন্যার পানিতে প্লাাবিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ৮০ ভাগ বসতবাড়ি পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের ৪৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তবে স্থানীয় পানিবন্দি মানুষজন জানান, কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি। জেলার ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, রোববার সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার,  ছাতকে ১৬৭ সে.মি. এবং যাদুকাটার পানি বিপদ সীমার ১০০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বেড়ে যাওয়া জেলা সদরের সাথে ছাতক ও তাহিরপুর উপজেলার সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হয়েছে ২১৩ মিলিমিটার। এর চেয়েও অনেক বেশি বৃষ্টি হয়েছে উজানের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে। ভারী বর্ষণ ও উজানের পানিতে জেলাজুড়ে বন্যা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন সীমান্ত উপজেলা সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক, দোয়ারা, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলাবাসী। পাহাড়ি ঢলে গ্রামের পর গ্রাম ডুবে যাচ্ছে, পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। দুর্ভোগে পড়া মানুষজন জ্বালানী ও খাদ্য সংকটে পড়েছেন।

সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন জেলা শহরের মানুষজন। সুুনাামগঞ্জ পৌর শহরের নবীনগর, ধোপাখালী, ষোলঘর, কাজীর পয়েন্ট, তেঘরিয়া, সাববাড়িরঘাট, হোসেনবখত চত্বর, পশ্চিম হাজীপাড়া, জগন্নাথবাড়ি, জেলরোড, লঞ্চঘাট, সুরমা মার্কেট, হাছননগর, মল্লিকপুর, কালীপুর, রায়পাড়া, সোমপাড়া, আরপিননগর, বড়পাড়াসহ সবকটি আবাসিক এলাকার সড়ক পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। নিচু এলাকার বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে। পৌর এলাকার সড়কগুলো পানিতে নিমজ্জিত থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। শহরের লোকজন পায়ে হেঁটে পানি মাড়িয়ে বাসাবাড়িতে চলাচল করছেন। জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা যায়, সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর, ছাতক, শাল্লাসহ ৯টি উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের ৪৪ হাজার ১১০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে পাহাড়ি ঢলে ও বৃষ্টিতে হঠাৎ বন্যায় জেলার বিভিন্ন ফসল ও সবজির আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢলের পানিতে ডুবে গেছে বীজতলা। জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, তিন হাজার ৭৬৫ হেক্টর আউশ ধানের জমি ও ১৮৮ হেক্টর বর্ষাকালীন সবজি ক্ষেত ঢলের পানিতে ডুবে গেছে। অধিদফতরের উপ পরিচালক মো. সফর উদ্দিন বলেন, আউশ ধানের জমি ও সবজি ক্ষেতের পানি নেমে গেলে কোনও ক্ষয়ক্ষতি হবে না। তবে জমিগুলো যদি ৩-৪দিন পানিতে ডুবে থাকে তাহলে ক্ষতি হবে।

ঢলের পানিতে ভেসে গেছে জেলার বিভিন্ন এলাকার মাছের ঘের ও পুকুর। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, কতোগুলো পুকুরের মাছ ঢলের পানিতে ভেসে গেছে তা এখনো জানা যায়নি। উপজেলা থেকে প্রতিবেদন আসলে জানা যাবে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে ৪১০ টন চাল এবং ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপজেলাসমূহে চার হাজার ৭৫২টি পরিবারের মধ্যে শিশু খাদ্য বিতরণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট প্রস্তুত করা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বলেন, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিগণ সব সময় দুর্গত মানুষের পাশে রয়েছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কঠোরভাবে পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে। কোথাও কোনও সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বন্যার পাশাপাশি করোনা সংক্রমণের হাত থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।