সায়ন্থ সাখাওয়াৎ: 

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে দেড় হাজারের বেশি। তার মধ্যে অর্ধশতাধিক চিকিৎসক! সঠিক পরিসংখ্যান জানা না থাকলেও প্রায় সবাই একমত, কভিড আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর বিপরীতে চিকিৎসক মৃত্যুর হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের মতো প্রতি দেড় হাজার মৃত্যুতে ৫০ জন চিকিৎসকের মৃত্যু হলে আমেরিকায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে সোয়া লাখ মৃত্যুর বিপরীতে চিকিৎসক মারা যাওয়ার কথা চার হাজারের বেশি। ব্রাজিল বা যুক্তরাজ্যে প্রায় দুই হাজার করে চিকিৎসকের মৃত্যু হওয়ার কথা করোনায়। এমনকি পাশের দেশ ভারতে ইতিমধ্যে প্রায় পাঁচশ চিকিৎসকের মৃত্যু হওয়ার কথা। কিন্তু ওইসব দেশে চিকিৎসক মৃত্যুর হার তেমন নয়। ৩১ মে পর্যন্ত ভারতে ৩১ চিকিৎসকের মৃত্যুর খবর দিয়েছে সে দেশের সংবাদমাধ্যম। করোনা রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে ইতালিতে সবচেয়ে বেশি চিকিৎসক ও নার্স মারা গেছেন বলে আলোচনায় আসে। কিন্তু সেই ইতালিতেও ৯ এপ্রিল পর্যন্ত যখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় সাড়ে সতেরো হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তখন চিকিৎসক মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১০০ জন। ওই সময়ের মধ্যে দেশটিতে নার্স মারা গেছেন ৩০ জন (এনডিটিভি, ৯ এপ্রিল ২০২০)।

১৫ এপ্রিল সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন আহমেদ কভিড আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সেটিই বাংলাদেশে কভিড আক্রান্ত হয়ে প্রথম কোনো চিকিৎসকের মৃত্যু। এর ১৮ দিন পর ৩ মে করোনা কেড়ে নেয় অধ্যাপক ডা. অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মনিরুজ্জামানকে। তারও আট দিন পর এ তালিকায় যুক্ত হয় অত্যন্ত পরিচিত মুখ রেডিওলোজিস্ট অধ্যাপক ডা. অবসরপ্রাপ্ত মেজর আবুল মুকারিম। তারপর থেকে দ্রুত বাড়তে থাকে চিকিৎসক মৃত্যুর সংখ্যা। প্রতিদিনই এ তালিকায় যোগ হচ্ছে কোনো না কোনো চিকিৎসকের নাম। তাদের প্রায় সবাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র চিকিৎসক থেকে শুরু করে তরুণ চিকিৎসক, কেউ বাদ যাননি করোনার হাত থেকে। তাদের সবারই যে অন্য কোনো রোগ ছিল এমনও নয়। একেবারেই নীরোগ সুঠামদেহী তরতাজা চিকিৎসকও হেরে গেছেন করোনার কাছে।

কিন্তু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে অস্বাভাবিকভাবে এত ব্যাপকসংখ্যক চিকিৎসক প্রাণ হারাচ্ছেন কেন? এর আংশিক উত্তর পাওয়া যাবে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ নামে একটি সংগঠনের জরিপের ফলাফল থেকে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের সেবায় নিয়োজিত সম্মুখসারির স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের ২৬ শতাংশ মে মাস পর্যন্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী বা পিপিই পাননি। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীরা পিপিইর মান এবং ব্যবহারের প্রশিক্ষণ না থাকায় উদ্বিগ্ন। নাগরিক সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ করোনাভাইরাস মহামারীতে সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর করা গবেষণায় এ তথ্য প্রকাশ করেছে। হেলথ ওয়াচের সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ (প্রথম আলো, ২০ জুন ২০২০)।

রিপোর্টে আরও লেখা হয়, মে মাসে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, তারা তখন পর্যন্ত পিপিই পাননি। তাদের মধ্যে ২৩ দশমিক ১ শতাংশ এমবিবিএস চিকিৎসক, ৫০ শতাংশ নার্স ও মিডওয়াইফ এবং ১২ দশমিক ৫ শতাংশ প্যারামেডিকস।

স্বাস্থ্যকর্মীদের মনের ওপর চাপ বাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে গবেষণায় বলা হয়, বিশেষ করে চিকিৎসকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বাড়তে থাকা চাপ কমাতে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমানের পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সেজন্য গবেষণায় পিপিইর পরিমাণ ও গুণগতমান নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ প্রদান, সম্মুখসারির স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণে কর্র্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু এই সুরক্ষাসামগ্রী না দেওয়া বা এর মান নিয়ে যারাই প্রশ্ন তুলেছেন, তারা ভোগ করেছেন শাস্তি। যেখানে শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালনের দিকে সরকার বেশি মনোযোগী সেখানে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন, সেটাই তো স্বাভাবিক।

আমরা জানি, সরকারি মাস্ক সরবরাহ না থাকায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক নিজ উদ্যোগে চিকিৎসক-নার্সদের মাস্ক কিনে ব্যবহার করতে বলায় তাকে পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক নিম্নমানের মাস্ক গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকেও বদলি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে পাবনার হেমায়েতপুরের মানসিক হাসপাতালে। এন৯৫ মাস্কের প্যাকেটে নকল মাস্ক সরবরাহ করা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে করা হয়েছে ওএসডি! নিম্নমানের পিপিই নিয়ে প্রশ্ন তোলায় নোয়াখালীতে শোকজ করা হয়েছে চিকিৎসককে। এমন বহু উদাহরণ আছে আমাদের সামনে।

বহু জায়গায় এমন নিম্নমানের বা নকল পিপিই সরবরাহের অভিযোগ আছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও ভিডিও কনফারেন্সে ঢাকা মহানগর হাসপাতালে মাস্ক নিয়ে নয়ছয় হওয়ার বিষয়ে অবহিত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন দেশবাসীকে। এসব নিয়ে তিনি তার ক্ষোভও প্রকাশ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী অবহিত হওয়ার পরও যেসব চিকিৎসক অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ তুলেছেন, তাদের শাস্তি পেতে দেখেছি আমরা। আর যারা অভিযুক্ত, তাদের কী শাস্তি হয়েছে, তা আজও জানা গেল না!

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য মতে, জুনের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত দেশে অর্ধশতাধিক চিকিৎসকের মৃত্যু ছাড়াও চার হাজারের বেশি চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যা যে আরও বেশি, তা বলাই বাহুল্য। কারণ অনেক প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারই আক্রান্ত হওয়ার পর বাড়িতে অবস্থান করেন এবং খুব সিরিয়াস অবস্থা না হলে কাউকে জানান না।

সুরক্ষাসামগ্রীর অপ্রতুলতা ও নিম্নমানের কারণে চিকিৎসকদের মৃত্যুর হার বাংলাদেশে এত বেশি বলে অনেকেই মনে করেন। সেই সঙ্গে আছে পর্যাপ্ত ট্রেনিংয়ের অভাব। এসব সুরক্ষাসামগ্রী কীভাবে ব্যবহার করবেন এবং তার ডিসপোজাল কীভাবে করতে হবে, তার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। সারা দেশের চিকিৎসকদের এ বিষয়ে যথাযথ ট্রেনিং দেওয়া হয়নি বলে অনেক চিকিৎসক যথাযথ নিয়মে এসব সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করছেন না বলেও অনেকে ধারণা করেন। চিকিৎসকদের এ ট্রেনিংয়ের ঘাটতির কথাটা উঠে এসেছে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের জরিপেও।

আমরা জানি, কভিড আক্রান্ত হলে তার সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। উপসর্গ ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা বিবেচনায় নিয়ে কভিড রোগীদের চিকিৎসা চালাতে হয়। এ ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মনোবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে থেকে যে শত্রু আক্রমণ করবে, তার শক্তি-সামর্থ্য ও তার বিরুদ্ধে শরীরের ভেতরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারার সক্ষমতার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে একজন রোগীর কী পরিস্থিতি হবে। এই দুয়ের যোগফল কখনো হবে শূন্য। অর্থাৎ কভিড হলেও কোনো উপসর্গ থাকবে না। কখনো দেখা দিতে পারে মৃদু উপসর্গ। আবার কারও বেলায় ভয়াবহ জটিলতা, এমনকি হতে পারে মৃত্যুও!

অন্যান্য দেশে উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী থাকার পরও বহুসংখ্যক চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশের চিকিৎসকদের মনোবল দুর্বল করে দিয়েছে শুরুতেই। আর চিকিৎসকদের চাকরি ও প্র্যাকটিসের ধরন পৃথিবীর খুব কম দেশেই বাংলাদেশের মতো পাওয়া যাবে। এখানে একজন চিকিৎসক সকালে হাসপাতালে যান। বিকেলে যান প্রাইভেট প্র্যাকটিসে। কখন বাসায় ফিরতে পারবেন তা নির্ভর করে কার রোগীর সংখ্যা কত, তার ওপর। সার্জনরা আবার এই দুয়ের মধ্যে দুপুরে বা রাতে করেন প্রাইভেট ওটি। ফলে তাদের শারীরিক ব্যায়াম ও বিনোদন বলতে তেমন কিছু নেই। অথচ ফিজিক্যাল ফিটনেস ও বিনোদন একজন মানুষের ইমিউনিটি তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে চিকিৎসকরা জাতির স্বাস্থ্যরক্ষার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন, তারাই করেন অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। শুধু অর্থ উপার্জন আর ভালো খাবার খেয়েই যে শরীর-মন ফিট রাখা যায় না, সেটা কে না জানেন। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের জীবনযাপন পদ্ধতিও তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা বাড়িয়ে তুলেছে, সেটাও ভেবে দেখা উচিত।

দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা জীবনযাপনের ধরন হয়তো সহসাই পরিবর্তন করা যাবে না। শরীর-মনে যে জঞ্জাল বাসা বেঁধেছে, সেটাও হয়তো এখনই দূর হবে না। তাই চিকিৎসকদের বাঁচাতে আমাদের হাতে আছে মূলত দুটি জিনিস। এক. মানসম্পন্ন করোনাপ্রতিরোধী সুরক্ষাসামগ্রী নিশ্চিতকরণ ও দুই. যথাযথ প্রশিক্ষণ। এই দুটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে নিঃসন্দেহে চিকিৎসকদের মনোবল বাড়বে, কমবে আক্রান্ত ও মৃত্যুঝুঁকি।।

মনে রাখতে হবে, কভিড মূলত একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। তাই চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বাঁচাতে না পারলে আমরা কেউ বাঁচব না।

লেখক

চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

sayantha15@gmail.com